মুক্তিযুদ্ধের সিপাহসালার বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানীর জন্মদিন আজ
সংগ্রাম-স্বাধীনতা
প্রকাশঃ ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৩৭ অপরাহ্ন
মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, যিনি বঙ্গবীর নামে পরিচিত, তার ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯১৮ সালের এই দিনে তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ মহকুমায় জন্ম নেওয়া এই সামরিক নেতা নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি সদ্যোজাত দেশের বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। তার কৌশলী নেতৃত্ব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
বঙ্গবীর ওসমানীর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বালাগঞ্জের দয়ামীর গ্রামে। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মা জোবেদা খাতুনের সন্তান হিসেবে পরিবারের চাকরির সূত্রে শৈশব কাটিয়েছিলেন গুয়াহাটিতে। পরে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং শিক্ষায় অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে এই কৃতিত্ব এমনই ছিল যে ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রাইওটোরিয়া পুরস্কারে সম্মানিত করে। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের মাধ্যমে তার শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
শিক্ষাজীবনের পর পেশার মোড় ঘুরে যায় সামরিক ক্ষেত্রে। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেরাদুনের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে কমিশন লাভের পর দ্রুত পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকেন। মাত্র এক বছরে ক্যাপ্টেন এবং পরের বছর মেজর পদে উন্নীত হন। অল্প বয়সেই ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিয়ে সামরিক দক্ষতার প্রমাণ রেখেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা রণাঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
ভারত ভাগের পর ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ওসমানী। পরের বছর কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি অর্জন করে জেনারেল স্টাফ ও সামরিক অপারেশনসের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে সেনা সদর দপ্তরে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তার সামরিক দক্ষতা ও কৌশলগত চিন্তাভাবনার পরিচয় আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সেই বছরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হওয়া গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় মুক্তির সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলে তিনি সামরিক প্রতিরোধ সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে তাকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় সামরিক নেতৃত্ব দেওয়া হয়। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো সুসংগঠিত হয়। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে দেশকে ১১টি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় স্থাপন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অস্ত্র সরবরাহে তার ভূমিকা ছিল মৌলিক। সীমিত সংখ্যক নিয়মিত সৈন্য দিয়ে গেরিলা ও গণবাহিনীর মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা ও অবস্থানকে দুর্বল করার যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে নৌ-কমান্ডো ও সীমিত বিমান সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগও তার নেতৃত্বে গ্রহণ করা হয়।
স্বাধীনতার পর ২৬ ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭২ সালের এপ্রিলে জেনারেল পদ বিলুপ্ত হলে তিনি সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে নৌপরিবহন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে আবারও নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিসভায় থাকেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরের বছর একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য পদ ও আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনার পর এই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি জাতীয় জনতা পার্টি নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের সভাপতি হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিভিন্ন জোটের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আজীবন অবিবাহিত ছিলেন ওসমানী। জীবনের শেষদিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গমন করেন। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে তার অবদান স্মরণে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। সিলেটে রয়েছে এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ওসমানী জাদুঘর। ঢাকায় নির্মিত হয়েছে ওসমানী উদ্যান এবং ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন। এই স্মারকগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসে তার অক্ষয় অবদানের জীবন্ত প্রমাণ বহন করে চলেছে।
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে সামরিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কর্মকর্তা, তারপর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদাধিকারী জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জীবন শুধু একজন সেনানায়কের জীবনী নয়; এটি বাঙালির রাষ্ট্রচেতনা, সামরিক নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
এম এ জি ওসমানী, বঙ্গবীর, মুক্তিযুদ্ধ, প্রধান সেনাপতি, জন্মদিন, স্মরণ