বাংলাদেশের নরম পলিমাটির ওপর দাঁড়িয়ে আপাতদৃষ্টিতে বোঝার উপায় নেই যে, এই ভূখণ্ডের গভীর তলদেশে প্রতিনিয়ত চলছে এক প্রলয়ঙ্করী লড়াই। ওপর থেকে শান্ত-শ্যামল মনে হলেও, ভূতাত্ত্বিক বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় এবং বিপজ্জনক ‘সিসমিক জোন’ বা ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। 


ইতিহাস সাক্ষী, এই জনপদ বারবার কেঁপে উঠেছে মাটির নিচের প্রবল আক্রোশে। ভূতত্ত্ববিদদের হুঁশিয়ারি এবং ইতিহাসের ধুলোমাখা নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি উঠে আসে, তা কেবল ভীতিজাগানিয়াই নয়, বরং আসন্ন এক মহাবিপর্যয়ের স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

কেন কাঁপছে বাংলাদেশ?


বাংলাদেশ মূলত তিনটি বিশাল এবং শক্তিশালী ‘টেকটোনিক প্লেট’ বা ভূ-খণ্ডের সংযোগস্থলে (Junction) দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো- ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মিজ প্লেট। 


ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের ভাষায়, ইন্ডিয়ান প্লেটটি স্থির নয়; এটি বছরে প্রায় ৬ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর-পূর্ব দিকে ধাবিত হয়ে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ধাক্কা দিচ্ছে। এই দুই মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষেই সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয় পর্বতমালা এবং তিব্বত মালভূমি। এই সংঘর্ষ এখনও থামেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ব দিক থেকে আসা বার্মিজ প্লেটের চাপ। 


এই ত্রিমুখী চাপে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ শক্তি বা ‘ইলাস্টিক স্ট্রেইন’ জমা হচ্ছে। 


বিজ্ঞানীদের মতে, একটি ধনুককে বাঁকা করলে যেমন শক্তি জমা হয় এবং ছেড়ে দিলে তা সজোরে আঘাত করে, ঠিক তেমনই মাটির নিচের এই চ্যুতিরেখাগুলোতে শতবর্ষ ধরে শক্তি জমা হচ্ছে। এই শক্তি যখন আর ধরে রাখা সম্ভব হবে না, তখনই ঘটবে ভয়াবহ ‘রাপচার’ বা ফাটল, যার ফলাফল-বিধ্বংসী ভূমিকম্প।

বাংলাদেশের মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য চ্যুতি বা ‘ফল্ট লাইন’। এর মধ্যে পাঁচটি প্রধান চ্যুতি অঞ্চলকে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন: ১. বগুড়া চ্যুতি অঞ্চল: ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টিতে সক্ষম। ২. ত্রিপুরা চ্যুতি অঞ্চল: ৭.০ মাত্রার ক্ষমতা সম্পন্ন। ৩. ডাউকি চ্যুতি অঞ্চল: ৭.৩ মাত্রা পর্যন্ত কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। ৪. আসাম চ্যুতি অঞ্চল: ৮.৫ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে। ৫. শিলং মালভূমি: ১৮৯৭ সালে এখানেই ৮ মাত্রার মহাদুর্যোগ ঘটেছিল।

তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি বয়ে এনেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রাউন্ড পজিশনিং সিস্টেম (GPS) ডাটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলের মাত্র কয়েক কিলোমিটার নিচেই লুকিয়ে আছে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সক্রিয় ‘সাবডাকশন জোন’।

এখানে ইন্ডিয়ান প্লেটটি বার্মিজ প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই ফাটলরেখায় বছরে ১৭ মিলিমিটার হারে চাপ বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই জোন থেকে ভবিষ্যতে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার ‘মেগা-থ্রাস্ট’ ভূমিকম্প হতে পারে। আর যেহেতু এটি বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকার ঠিক নিচেই অবস্থিত, তাই এর ফলাফল হতে পারে কল্পনাতীত।

বাংলাদেশের ভূমিকম্পের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় ধরনের বিপর্যয় এখানে নিয়মিত বিরতিতে ফিরে এসেছে।

● ১৫৪৮ ও ১৬৬৩ সালের প্রলয়: ১৫৪৮ সালে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাটি ফেটে কাদা-জল বেরিয়ে আসার (Liquefaction) রেকর্ড পাওয়া যায়। ১৬৬৩ সালে আসাম ও সিলেটে হওয়া ভূমিকম্পটি প্রায় আধা ঘণ্টা স্থায়ী ছিল বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, যা এক দীর্ঘস্থায়ী ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।

● ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প: ১৭৬২ সালের এপ্রিলে আঘাত হানা আনুমানিক ৮.৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প ছিল প্রকৃতির এক রুদ্ররোষ। এর প্রভাবে টেকনাফ ও মিয়ানমার সীমান্তের ভৌগোলিক কাঠামোই বদলে যায়। চট্টগ্রামের উপকূলীয় প্রায় ১৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা চিরতরে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। ঢাকায় এই কম্পনে বহু জলাশয়ের পানি উপচে পড়ে এবং ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

● ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প: ৭.০ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি ‘মানিকগঞ্জ ভূমিকম্প’ নামে পরিচিত। এর উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছে হওয়ায়, এটি ঢাকা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

● ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক: ১২ জুনের এই ভূমিকম্পটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ। ৮.১ মাত্রার এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শিলং মালভূমিতে হলেও এর ধাক্কায় তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়। সিলেটে ৫৪৫ জন নিহত হয়। ঢাকায় আহসান মঞ্জিলসহ বহু ঐতিহাসিক ও সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং মাটির নিচ থেকে বালু উঠে এসে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে।

ছোট কম্পন কি বড় বিপদের পূর্বাভাস?


অনেকের ধারণা, ছোট ছোট ভূমিকম্প হলে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমে যায়। এটি একটি ভুল ধারণা। ১৯৭৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২৮৪টি ভূমিকম্পের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে গত এক দশকে এই হার উদ্বেগজনক। 


ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ছোট কাঁপুনিগুলো প্রমাণ করে যে মাটির নিচের ফল্ট লাইনগুলো 'লক' হয়ে আছে এবং সেখানে প্রবল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। প্লেটগুলো যখন একে অপরকে অতিক্রম করতে পারে না, তখন তারা বেঁকে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। ছোট ভূমিকম্পগুলো সেই শক্তির সামান্যই নির্গমন করে, কিন্তু মূল বিপদটি ভেতরেই থেকে যায়। অর্থাৎ, আমরা একটি বড় ধাক্কার অপেক্ষায় আছি।

ঝুঁকির নতুন মাত্রা: অপরিকল্পিত নগরায়ন


১৮৯৭ সালে যখন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন ঢাকা বা চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ছিল নগণ্য, আর দালানকোঠা ছিল হাতেগোনা। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। একটি বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজ চালানোর মতো রাস্তাও অনেক এলাকায় নেই। ঢাকার বিশাল অংশ জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের সময় এই ভরাট করা মাটি তরল কাদার মতো আচরণ করতে পারে, যার ফলে বড় বড় দালান মাটিতে দেবে যাওয়ার বা হেলে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি হাজার হাজার ভবন এই শহরের মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ভূমিকম্প ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সক্ষমতা আমাদের আছে। ১৭৬২ বা ১৮৯৭ সালের পুনরাবৃত্তি যদি আজ ঘটে, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে অকল্পনীয়। তাই এখনই সময় নড়েচড়ে বসার। 


জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা জরুরি। ভবন নির্মাণের সময় 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড' (BNBC) কঠোরভাবে মেনে চলা, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করা (Retrofitting) এবং ভরাট করা জমিতে পাইলিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় দুর্বল অবকাঠামোর কারণে।

প্রকৃতি তার সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই কেঁপে ওঠা মাটি আমাদের সেই বার্তাই দিচ্ছে। আমরা কি সেই বার্তা শুনতে পাচ্ছি, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ার অপেক্ষায় আছি?

  • রিপন ঘোষ: শিক্ষক ও লেখক


[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব। এতে প্রকাশিত মন্তব্য, বিশ্লেষণ বা বক্তব্য সিলেট ভয়েস-এর অবস্থান, নীতিমালা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। লেখকের উপস্থাপিত তথ্য বা বক্তব্যের দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজের।]


শেয়ার করুনঃ