দখল ও দূষণে ধুঁকছে বাসিয়া নদী, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন
সিলেটের বিশ্বনাথে এক সময়ের প্রমত্তা বাসিয়া নদী এখন দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার চাপে মৃতপ্রায়। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি কোথাও কোথাও সরু নালায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, ‘বাসিয়া এখন আর নদী নয়, একটি ‘বিষাক্ত’ ড্রেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্বনাথ পৌর শহর, নতুন ও পুরাতন বাজারসহ নদীর দুই তীরজুড়ে জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। প্রতিদিন রাতের আঁধারে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।
দিনের বেলা সেই জমে থাকা আবর্জনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পচা বর্জ্যের উৎকট গন্ধের সঙ্গে মিশে বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশের পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, এই দুর্গন্ধে কখনও দিন-রাত পার করা দায় হয়ে ওঠে।
দখলের চিত্রও উদ্বেগজনক। সিলেটের জালালাবাদ এলাকার মাসুকগঞ্জ বাজার থেকে উৎপত্তি হয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জ এলাকায় কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হওয়া বাসিয়ার উৎস ও নিষ্কাশনমুখ দুটোই ভরাট হয়ে পড়েছে।
গত দুই-তিন দশকে নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কোথাও নদীর ভেতরেই মাটি ভরাট করে বসতঘর ও দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এক সময় প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত নদীটি সংকুচিত হয়ে অনেক স্থানে কয়েক ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসে না। আর শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায় নদীর একপাড় থেকে অন্যপাড়ে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদীর তীরে অবৈধ দখল উচ্ছেদে ২০১৭ সালে ১৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা (নং ০৪/২০১৭)। করা হলেও দীর্ঘ আট বছরেও তা কার্যকর হয়নি। দখলদারদের করা রিটের কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনি জটিলতার সুযোগে দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
‘বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদের আহবায়ক ফজল খান বলেন, বাসিয়া নদী রক্ষা করতে দীর্ঘদিন ধরে আমরা আন্দোলন করছি, কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। কারণ এখানে রক্ষকরাই ভক্ষক।
এদিকে, দূষণের প্রভাব সরাসরি পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নদীর দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাপানি, এলার্জি ও চর্মরোগ বেড়েছে। দূষিত পানি ও পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগও ছড়াচ্ছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে বসবাস করলে ফুসফুসের জটিলতা এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আনিসুল হোসেন বলেন, বাসিয়া নদীর ময়লা-আবর্জনা থেকে মানুষের মধ্যে হাপানী-শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে। দূষিত পানি থেকে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।
এদিকে নদীপাড়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দিরেও এর প্রভাব পড়েছে। দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না। ধর্মীয় স্থানে আসা মানুষও অস্বস্তিতে পড়ছেন। ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে নদীতে ময়লা ফেলছেন। পৌরসভার ডাস্টবিন অপ্রতুল এবং ব্যবস্থাপনাও দুর্বল।
পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, দুর্গন্ধ কমাতে নদীর তীরে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হচ্ছে এবং নতুন করে স্থায়ী ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদীর উৎস ও নিষ্কাশনমুখ পুনঃখননের প্রক্রিয়া চলছে এবং আদালতের রায়ের পর অবৈধ দখল উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ফেলা ও ময়লায় আগুন দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্বনাথ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর বলেন, ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য নির্ধারিত কোন স্থান না থাকায়, তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন। পৌরসভার পক্ষ থেকে ময়লা ফেলার কিছু ডাস্টবিন রাখা হয়েছে, তবে সেগুলোর ধারণ ক্ষমতা কম হওয়ায় সহজেই তা ভরে যায়। যে কারণে রাতের আধাঁরে নদীতেই ফেলেন পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা।
বিশ্বনাথ পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, ‘দূর্গন্ধের জন্য নদীর দুই তীরে নিয়মিত দেয়া হচ্ছে ব্লিচিং পাউডার। আর বিশ্বনাথ পৌর শহরের নতুন ও পুরান বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য স্থাপন করা হচ্ছে স্থায়ী ডাস্টবিন।’
এ ব্যাপারে বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে কুলসুম রুবি বলেন, বাসিয়া নদী যাতে কেউ ময়লা-আবর্জনা না ফেলেন সেজন্য পৌরসভার উদ্যোগে পৌর শহরের ‘নতুন ও পুরান বাজারে’ শীঘ্রই স্থায়ী ডাস্টবিন স্থাপন করা হবে। নদী তীরের ময়লার স্তুপে কেউ আগুন লাগালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানার ওসিকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাসিয়া নদীর উৎস মুখ ও পতন মুখ পুনঃখনন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আর দুই তীরে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ মামলার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দখলকারীদের দুটি রিট চলমান থাকায় আপাতত উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে রিট মামলার রায়ের পর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাসিয়া খাল, বিশ্বনাথ, সিলেট, নদী দখল, পরিবেশ