মঙ্গলবার সৌদি আরবের মানুষ ঘুম থেকে উঠে দুটি উদ্বেগজনক খবর জানতে পারে।


প্রথম খবরটি ছিল রিয়াদের ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে একটি ড্রোন হামলা হয়েছে। এই ঘটনায় শুধু নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অনুভূতিই তৈরি হয়নি, সৌদিদের কাছে মার্কিন দূতাবাসটি অনেক স্মৃতির জায়গাও। সম্প্রতি সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনির সময় সেখানে স্বাধীনতা দিবসের একটি আয়োজন হয়েছিল, যা যেন আক্ষরিক অর্থেই ‘চাঁদকে কাছে নিয়ে এসেছিল’। সেই অনুষ্ঠানে মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে পপসংস্কৃতি সৌদি ও আমেরিকানদের যৌথ অর্জন উদযাপন করা হয়েছিল।


মধ্যপ্রাচ্যের অনেক স্থানের তুলনায় আধুনিক সৌদিদের হৃদয় ও চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। তাই সৌদি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা অনেকের কাছেই যেন আমাদের ওপরই হামলার মতো মনে হয়েছে।


কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও একটি উদ্বেগজনক খবর আসে। শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল-আরাবিয়া জানায়, তাদের সূত্র অনুযায়ী সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে চালানো কিছু ড্রোন হামলার উৎস হয়তো ইরান নয়, বরং একটি আরব দেশ—ইরাক।


এই খবরটি আসে এমন এক সময়ে, যখন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি সিএনএনকে বলেন, “সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, এটি ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্য ছিল না।”


অবশ্য এটাও জানা যে ২০০৩ সালের যুদ্ধের পর যা ছিল আরেকটি দুর্বল পরিকল্পনার মার্কিন হস্তক্ষেপ—ইরাক ধীরে ধীরে ইরানি প্রভাব, প্রক্সি গোষ্ঠী ও মিলিশিয়াদের কার্যত একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।


গত সপ্তাহে তথাকথিত ইরাকি হিজবুল্লাহ মিলিশিয়া দাবি করেছে যে তারা সামরিক ড্রোন ব্যবহার করে ১৬টি অভিযান চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল “ইরাকের ভেতরে ও বাইরে শত্রুদের বিরুদ্ধে”। ইরানঘনিষ্ঠ এই শক্তিশালী মিলিশিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে।


যদি এই তথ্য সত্য হয়, তাহলে ইরাকের সঙ্গে একটি গুরুতর আলোচনা হওয়া জরুরি—শুধু সৌদি আরব নয়, যেসব দেশ এই ড্রোন হামলার লক্ষ্য হতে পারে তাদের সবার পক্ষ থেকেই।


ইরাক রাষ্ট্র হিসেবে এসব মিলিশিয়ার সঙ্গে জড়িত নয়—এমন যুক্তি টেকসই নয়। কারণ নিজেদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় থেকে বাগদাদ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারে না, বিশেষ করে যখন সেই গোষ্ঠীগুলো ইরাক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।


এদিকে মঙ্গলবার রাতে ইরাকি সরকার জানায়, তারা ইরবিলের মার্কিন কনস্যুলেটের দিকে যাওয়া একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরাকের ভেতরে ড্রোন হামলা প্রতিরোধের বেশ কিছু প্রচেষ্টার খবরও এসেছে।


কিন্তু যদি এসব প্রতিবেদন সত্য হয়, তাহলে ইরাককে আরও সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে নিজের ভূখণ্ডে থাকা মিলিশিয়াদের সীমান্তপারের হামলা ঠেকাতে। সামরিক ভাষায় বলতে গেলে, তাদের ধনুক ভেঙে দিতে হবে এবং উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো নীরব করতে হবে।


নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক দিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের ভাষায় ‘তীর’ অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধ করতেই ব্যস্ত। কিন্তু প্রতিটি তীরের পেছনে থাকে একজন ধনুর্ধর ও একজন নির্দেশদাতা।


যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে, তা হলো সেই ধনুর্ধরদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ড্রোন স্থাপনাগুলো—লক্ষ্য করে হামলা চালানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা সফলভাবে? সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধের পর তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন আরও বাড়িয়েছে এবং উৎক্ষেপণের স্থানও বৈচিত্র্যময় করেছে। ইরাকি ভূখণ্ড হয়তো আগের হামলা পরিকল্পনায় পুরোপুরি বিবেচনায় আনা হয়নি।


চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরান এখনও ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা দেখিয়ে যাচ্ছে।


এরপর আসে আরেকটি জটিল বিষয়—‘নির্দেশদাতাদের’ নির্মূল করা। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তা কার্যত করেছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের হত্যা করে তারা হয়তো একটি তাৎক্ষণিক কৌশলগত বিজয় দাবি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা সম্ভাব্য আলোচনার পক্ষকেও সরিয়ে ফেলেছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আরব ও উপসাগরীয় মিত্ররা যেন শব্দের খেলায় বললে ইরাক ও কঠিন বাস্তবতার মাঝখানে আটকে পড়েছে।


তাহলে সামনে পথ কোথায়?


ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের বিভিন্ন বক্তব্যে লক্ষ্য নির্ধারণ বারবার বদলাচ্ছে, ফলে শেষ লক্ষ্য কী—তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটি কি শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা? যদি তাই হয়, তবে বিকল্প নেতৃত্ব কে? নাকি উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা—যা সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী গত জুনে “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার”-এ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা।


তবে আলোচনার একটি সম্ভাবনা এখনো আছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার দরজা খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।


কিন্তু নতুন কোনো ইরানি নেতৃত্ব কি একই পরিণতির মুখে পড়বে না যেমনটি বিদেশে লক্ষ্যবস্তু হওয়া অন্য প্রতিপক্ষদের হয়েছে? কিংবা ওমান—যা একসময় তেহরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মধ্যস্থতাকারী ছিল—নিজেই কি আক্রমণের লক্ষ্য হবে না, যদি কোণঠাসা ও মরিয়া ইরান প্রতিক্রিয়া দেখায়?


এই লেখাটি শেষ করা যেতে পারে সান জুর বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য আর্ট অব ওয়ার” থেকে একটি উদ্ধৃতি দিয়ে:


‘যখন তুমি একটি বাহিনীকে ঘিরে ফেলো, তখন বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ খোলা রাখো তখন মরিয়া শত্রুকে খুব বেশি চাপে ফেলো না।’


  • ফয়সাল জে. আব্বাস : এডিটর-ইন-চিফ, আরব নিউজ


[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব। এতে প্রকাশিত মন্তব্য, বিশ্লেষণ বা বক্তব্য সিলেট ভয়েস-এর অবস্থান, নীতিমালা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। লেখকের উপস্থাপিত তথ্য বা বক্তব্যের দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজের।]


শেয়ার করুনঃ