ড. ইফতেখার আহমদ
আন্তর্জাতিক চা দিবস: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও চা শিল্পে AI প্রযুক্তির ব্যবহার
খালেদ উদ-দীন
প্রকাশঃ ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:০৫ অপরাহ্ন
ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ স্যার ছিলেন আমাদের জীবনের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা—একজন শিক্ষক, যিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ছাত্রছাত্রীদের চিন্তা, চেতনা ও মানবিক বোধকে জাগ্রত করার এক অনন্য সাধনায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠেছিল কেবল জ্ঞান বিনিময়ের স্থান নয়, বরং মুক্তচিন্তার এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। সেখানেই তিনি প্রজ্বলিত করেছেন প্রগতির দীপশিখা, উচ্চারণ করেছেন মানবতার বাণী, আর শিখিয়েছেন সময়কে বদলে দেওয়ার সাহসী মন্ত্র। তাঁর সেই প্রেরণায় উজ্জীবিত অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে, বহন করছে তাঁর শিক্ষার দীপ্ত উত্তরাধিকার।
মফস্বল জীবনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আমরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হই, তখন আমাদের অনেকের চিন্তাজগৎ ছিলো প্রথা ও রক্ষণশীলতার বেড়াজালে আবদ্ধ। সেই প্রেক্ষাপটে ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ স্যার আমাদের কাছে যেন এক নবজাগরণের দূত হয়ে আবির্ভূত হন। তিনিই প্রথম আমাদের সামনে উন্মোচন করেন বাংলা সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য এবং আধুনিকতার বহুমাত্রিক দিগন্ত। তাঁর মুখে আমরা শুনি নতুন নতুন বইয়ের কথা, লেখক ও চিন্তাবিদদের কথা—যারা সময় ও সমাজকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। আমরা মুগ্ধ শ্রোতার মতো সেই আলোয় ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকি, আবিষ্কার করি এক বিস্ময়কর বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ।
স্নাতক পর্যায়ের একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করা—এই সত্যটি স্যার তাঁর কর্মজীবনে অসাধারণ দক্ষতায় বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি কেবল পাঠ্যবিষয় শেখাননি, বরং স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আশার বাণী শুনিয়েছেন এবং বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মা ও মাটির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা। তাঁর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হতো—“এই সমাজ বদলে দিতে হবে, নতুন এক সমাজ গড়ে তুলতে হবে”—তখন সেই উচ্চারণ আমাদের তরুণ হৃদয়ে সৃষ্টি করতো তীব্র আলোড়ন। সেই অনুপ্রেরণাই আমাদের প্রথাগত সংকীর্ণতা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
ডিরোজিও ও হিন্দু কলেজের প্রসঙ্গ যখন স্যার তুলতেন, তখন আমরা অনুভব করতাম নবজাগরণের সেই বিদ্রোহী স্পন্দন। স্যারের রচিত ডিরোজিও বিষয়ক গ্রন্থ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছিল এ অঞ্চলে রেনেসাঁ, ইউরোপীয় প্রভাব এবং আধুনিকতার সূচনার এক নতুন দিগন্ত। শ্রেণিকক্ষে তাঁর সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—“তোমাদের এক হাতে থাকবে বই, অন্য হাতে থাকবে হাতুড়ি, বই পড়ে শিখবে আর হাতুড়ি দিয়ে এই সমাজ ভেঙে নতুন এক সমাজ গড়বে, যে সমাজে থাকবে না কোনো বৈশম্য”—আমাদের চিন্তার জগতে এক গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ এবং সেই জ্ঞানের শক্তিতে সমাজকে পুনর্গঠনের যে আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, তা আমাদের কাছে ছিল একই সঙ্গে দুঃসাহসিক ও দীপ্তিময় এক স্বপ্ন।
অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্যারের রচিত ‘সাহিত্যের কাল ও কালান্তর’ গ্রন্থ প্রকাশিত হলে আমরা তা সংগ্রহ করি তাঁর স্বাক্ষরসহ। গ্রন্থটির ‘সাহিত্যে চালিয়াতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি যে সাহসিকতার সঙ্গে সাহিত্যজগতের অনৈতিক অনুকরণপ্রবণতার সমালোচনা করেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর সেই বিশ্লেষণ আমাদের শিখিয়েছে মৌলিকতার মূল্য এবং সততার গুরুত্ব।
শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে—উভয় ক্ষেত্রেই স্যার ছিলেন আমাদের চিন্তা ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সমসাময়িক সমাজ, সাহিত্য কিংবা জীবনের যে কোনো জটিল প্রশ্নে আমরা তাঁর শরণাপন্ন হতাম। তিনি সহজ ভাষায়, গভীর প্রজ্ঞায় আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেন এবং আমাদের ভাবনার পরিধিকে প্রসারিত করতেন।
আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর বাণী, তাঁর দেখানো পথ—সবই আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। জীবনের প্রতিটি বাস্তবতায়, প্রতিটি নৈতিক সংকটে, আমরা যেন তাঁর কণ্ঠস্বরই শুনতে পাই। সেই অর্থে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন—তিনি আমাদের চেতনার অংশ, আমাদের অন্তর্লোকের এক অনির্বাণ জ্যোতি।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]