রিপন ঘোষ
পায়ের নিচে সুপ্ত বিপদ: বাংলাদেশের ভূমিকম্পের অতীত, বর্তমান ও আসন্ন মহাবিপদ
কাসমির রেজা
প্রকাশঃ ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৪৮ অপরাহ্ন
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় অন্তত অর্ধশত হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরেও। বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী সুনামগঞ্জ জেলায় অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত। এসব জমির কাঁচা ধান গাছে পচন ধরেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, সিলেট বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। তাই এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে একদল কৃষক হাওরে বাঁধ কেটে দিতে চাচ্ছেন। অন্য আরেক দল কৃষক ও স্থানীয় প্রশাসন এতে বাধা দিচ্ছেন। এনিয়ে সংঘর্ষেও জড়াচ্ছেন কৃষকরা। সুনামগঞ্জের ডাকুয়া হাওরে জলাবদ্ধতা বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ কেটে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চারটি গ্রামের লোকজন সংঘর্ষে জড়ায়। এতে ১৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে। এমন ঘটনা ঘটছে আরও কয়েকটি হাওরে। ফসল রক্ষায় এখন উভয় সংকটে হাওরের কৃষকরা।
এখন হাওরের কৃষকরা জলাবদ্ধতা সমস্যায় পড়েছেন তা থেকে রেহাই পেতে করণীয় নির্ধারণে কোনও সময় ক্ষেপণ করা যাবে না। স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও গবেষকদের কারিগরি জ্ঞানের সমন্বয় করে— যা করার তা দ্রুত করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে হাওরের ফসল রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
বন্যা হোক কিংবা জলাবদ্ধতা উভয় ক্ষেত্রেই কৃষকের ক্ষতির ধরন একই। পানিতে তলিয়ে যায় স্বপ্নের সোনালি ফসল। কৃষকরা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। শুধু ফসলই নয়, গবাদিপশুর খাদ্য সংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের সিংহ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য হাওরগুলোর মধ্যে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওড়, জামালগঞ্জের হালির হাওড়, পাগনার হাওড়, তাহিরপুরের শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড় , দিরাই উপজেলার কালিকোটা, টাংনি, হুরামন্দিরা, বরাম ও চাপতির হাওর, মধ্যনগরের ঠগার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাই হাওর, খাই হাওর, জামখলা হাওর ও কাঁচিভাঙা হাওরসহ অর্ধশতাধিক হাওরের নিচু জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
সরকার ফসল রক্ষায় শত শত কোটি টাকা খরচ করে ঠিকই, তবে পরিকল্পনাহীনভাবে। এ বছর সুনামগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে ১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ব্যাপক ফসল হানির পর বিগত সাত বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা বাঁধের নিচে খরচ হয়েছে। কিন্তু এই বাঁধই এখন কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সমীক্ষা ছাড়াই হাওরে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা খুব জরুরি। গবেষণার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে হাওর সমস্যার সমাধান করতে হবে। দুয়েকদিনের মধ্যে হাওর থেকে পানি নামানোর ব্যবস্থা করলে রক্ষা পেতে পারে কিছু ধান।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে কৃষকরা পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন— যা যথেষ্ট নয়। কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্লুইসগেট স্থাপন ও পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছেন। হাওরের কিছু অংশে স্লুইসগেট স্থাপন করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি অপসারণ করা সম্ভব হবে। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে। স্লুইসগেটের সক্রিয় ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এটি অকার্যকর হয়ে পড়বে— যাতে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে হাওর ব্যবস্থাপনার একটি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
অপরদিকে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের অর্ধেক কাজ ও শেষ হয়নি, যা নজিরবিহীন। হাওরের অধিকার কর্মীরা সভা, মানববন্ধন করে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন আগে থেকেই। মার্চ পেরিয়ে এপ্রিল এলেও শতভাগ বাঁধের কাজ শেষ হয়নি।
সরকার খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় হাওর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে খাল ও নদী খনন করা গেলে সমস্যা লাঘব হতে পারে। তবে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে খাল বা নদী খনন কাজে আসবে না। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নদীগুলো খনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বোরো মৌসুমে হাওরে যেমন অনাহুত পানি জমতে দেওয়া যাবে না, তেমনই অতিবৃষ্টির বা পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে ঢুকতেও দেওয়া যাবে না। এই বিপরীতমুখী দুই উদ্দেশ্য কী উপায়ে সমন্বয় হবে— তার সঠিক ও কার্যকর পথ বের করা হাওরের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের অপরিহার্য। যা কিছুই করা হোক তা করতে হবে হাওরের চরিত্রকে মাথায় রেখে। নেচার বেইজড সল্যুশনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। জোর করে কিছু করতে গেলে যে হিতে বিপরীত হয়, তা ফসল রক্ষা বাঁধের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব। এতে প্রকাশিত মন্তব্য, বিশ্লেষণ বা বক্তব্য সিলেট ভয়েস-এর অবস্থান, নীতিমালা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। লেখকের উপস্থাপিত তথ্য বা বক্তব্যের দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজের।]