হাওরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা
কৃষি
প্রকাশঃ ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৩৯ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার রুপেশ্বর হাওরের শাইল্যানি গ্রামের কৃষক তারা মিয়া নিজে এবং বর্গাচাষীর মাধ্যমে প্রায় ৬ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু আগাম বন্যায় অর্ধেকের বেশি ধান এখন জলমগ্ন।
তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো হইলে ধান হয়তো টিকতো কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে অর্ধেক ধানও টিকবে না। হাওরের পানি সরাতে ৫০/৬০টি সেচ মেশিন দিয়ে পানি টানা হচ্ছে, কিন্তু যেটুকু নামছে, তা পরদিন ভরে যাচ্ছে।’
একই বাস্তবতা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইন বাড়মসজিদ এলাকার হাকালুকি হাওরের কৃষক আব্দুল হাকিমের। তার ১৫ একর বোরোধানের সবই এখন পানির নিচে।
‘আগে সামান্য পানি ছিল, গত শুক্রবার-শনিবারের বৃষ্টিতে পানি দ্রুত বেড়ে ধান তলিয়ে গেছে। ধানে মাত্র দুধ এসেছিলো, এ অবস্থায় পানির নিচে কিছুদিন থাকলেই সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে,’ বলেন তিনি।
মেঘালয় পাদদেশে অবস্থিত সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আগাম বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়া প্রতিবছরের একটি সাধারণ দৃশ্য। ঢলের পানি বাঁধা দিয়ে ধান বাঁচানোর জন্য সরকার শতকোটি টাকা খরচ করে বাঁধও নির্মাণ করে প্রতিবছর।
কিন্তু এবছর পাহাড়ি ঢল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের ফলেই হাওরাঞ্চলের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মেঘালয়ে বৃষ্টিপাতের ফলে নদনদী ও খালবিলের পানি দ্রুত বাড়তে থাকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে সিলেট বিভাগে ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে যা এই মাসের স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম থেকেও প্রতিদিনই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এছাড়া ভারতের মেঘালয়েও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিমাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এর ফলে নদীপ্রবাহ থেকে নিচু এলাকায় কিংবা ফসল রক্ষা বাঁধের কারণে নিষ্কাশনের ব্যবস্থাহীন জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কিছু জায়গায় শ্যালো মেশিন লাগিয়ে এবং কোথাও বাঁধ কেটেও চেষ্টা চলছে পানি নিষ্কাশনের। অন্যদিকে নদী ও খালে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি চলে আসায় পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে না।
সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সোমবার (৬ এপ্রিল) পর্যন্ত বিভাগের ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমি জলমগ্ন হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাতেই ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর। এর বাইরে হবিগঞ্জে ২৮১ হেক্টর ও মৌলভীবাজারে ১৭০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধ রয়েছে।
তবে হাওর সুরক্ষায় আন্দোলনরত সংগঠনগুলোর দাবি, সুনামগঞ্জ জেলার হাওরেই অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এসকল হাওরের কৃষকদের একমাত্র ফসল বোরো ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষকেরা রয়েছেন চরম সংকটে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি অফিসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘দুই সপ্তাহের উপর টানা বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার ছাতক উপজেলার ছাড়া সকল উপজেলার হাওরের নিম্নভূমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক ধারণা ছিল বৃষ্টি কমলে পানি নামবে কিন্তু নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এবং চৈত্র মাসে শুষ্ক না থেকে খাল-জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামছে না।’
তিনি বলেন, ‘গত চারবছর ধরে চৈত্রমাসে এতটা বৃষ্টিপাত হয়নি, ফলে হাওরের অনেক নিম্নভূমি শুকনো থাকায় সেখানে চাষাবাদ শুরু হয়। এছাড়াও জলমহালগুলোতে ধান চাষ নিষেধ থাকলেও পানি কমে যাওয়ায় সেসব জায়গায়ও চাষাবাদ হয়েছে। এবছর বৃষ্টিতে এসকল ভূমি আগে জলাবদ্ধ হয়েছে।’
এরই মধ্যে গত ৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার ছনুয়ার হাওরের কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় গ্রামবাসী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংলগ্ন ডাকুয়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে দিতে গেলে দুই অংশের গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং পরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
একইদিনে ধর্মপাশা উপজেলার টগার হাওরপাড়ে বনিয়া নদীর মুখে স্থানীয় কৃষকদের বানানো বাঁধ কেটে দেন শৈলচাপড়া হাওরপাড়ের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা। এ নিয়ে দুই অংশের কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এদিনই সিলেট নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে হাওর রক্ষার দাবি নিয়ে মানববন্ধন করেছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা। মানববন্ধনে বক্তারা হাওরের জন্য টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের আহবান জানান।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, ‘কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সমীক্ষা ছাড়া হাওরের বাঁধ দেয়ার ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা হচ্ছে, অন্যদিকে হাওরের প্রতিবেশের উপর প্রভাব ফেলছে।’
তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কিছু কিছু জায়গায় স্লুইস গেট স্থাপন করা প্রয়োজন। তাছাড়া উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প দিয়ে পানি হাওর থেকে বের করে নদীতে ফেলা দরকার। তবে হাওরের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রচেষ্টা হবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে হাওরের খাল ও নদী গুলো খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর সিলেট বিভাগে ৪,৯৭,৬৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে যার মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাতেই ২,২৩, ৫০৫ হেক্টর জমি রয়েছে। এসকল জমি থেকে চলতি বছর ২০ লক্ষ ৬০ হাজার ৪৫১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত হাওরে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ মোট আবাদের ২ শতাংশেরও কম। কিন্তু যে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে, তিনি শতভাগই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ কারণে আমরা উপজেলা পর্যায়ে একটি করে কমিটি গঠন করে দিয়েছি যাতে তারা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন হলে কৃষকদের বাঁধ কাটার অনুমতি দিবেন। এবং এ বাঁধ কৃষকরাই আবার পুনঃনির্মাণ করবেন।’
তিনি বলেন, ‘সদরের জলাবদ্ধ হাওরাঞ্চলে ৭০০ মিটারের মতো খাল খননের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা মাসখানেকের মধ্যে শেষ। এর ফলে এই অঞ্চলে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। এছাড়াও জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সহায়তায় বড় পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
ডিসি ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘কৃষকরা বুঝতে পারছেন যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে হাওরাঞ্চলের গভীরে আসলে তেমন কিছুই করণীয় থাকে না। প্রাথমিকভাবে অনেকস্থানে উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তারা বাস্তবতা বুঝতে পারছেন এবং সবার সহযোগিতায় আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।’
সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জলমগ্ন জমির ধান নষ্ট হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি, পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধান অনেকাংশেই রক্ষা পাবে। এছাড়াও কিছু জায়গায় স্বল্প পরিসরে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ১৮২ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে পুরোদমে ধান কাটার মৌসুম শুরু হবে।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ে গত রবিবার আয়োজিত বোরো ধান বিষয়ক বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ হাওরের বোরো ধান রক্ষায় সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে আবহাওয়ার দিকে বিশেষ নজর রেখে দ্রুত ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন প্রস্তুত এবং কৃষি শ্রমিক নিয়োগের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, বোরো ধান, কৃষক, জলাবদ্ধতা, বন্যা,