উজ্জ্বল মেহেদী
জলমহালও ‘গনিমতের মাল’!
দুলাল মিয়া
প্রকাশঃ ৭ মে, ২০২৬ ২:১৮ অপরাহ্ন
হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের হাওর গুলো যেমনি ধানের ভান্ডার তেমনি মৎস্যেরও ভান্ডার। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে হাওরের বিস্তীর্ণ জলাভূমি থেকে। কিন্তু প্রায়ই বন্যা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওরে জলজ প্রাণী ও মাছের মড়ক দেখা দেয়। এই মড়ক কেবল জলজপ্রাণী ও মাছের ক্ষতি নয়;বরং হাওরপাড়ের মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিপন্ন করে তোলে। হাওরের ওই সংকট মোকাবেলায় কেবল প্রতিকার নয়; প্রয়োজন জোরালো আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা।
সুদূর অতীত থেকেই হাওর বিপর্যয়ের গল্প শুরু হয়েছে। এই গল্পের নির্মম পুনরাবৃত্তি হিসেবে
২০১৭ সালে হাওরবাসীর জন্য এক মহাবিপর্যয় নেমে এসেছিল। সুনামগঞ্জ জেলার ছোট- বড় প্রায় ১৩৭টি হাওরেই পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে কৃষকের স্বপ্নের সোনার ফসল তলিয়ে গিয়ে ছিল। হাওর জুড়ে ছিল শুধু হাহাকার। মানুষের কান্নায় হাওরের জল আর চোখের জল একাকার হয়ে গিয়ে ছিল। সে সময় হাওর অঞ্চলে এক করুণ পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল।তখন হাওরের কাঁচা -পাকা ধান পচে অ্যামোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি হয়। এই গ্যাসের কারণে পানির স্বাভাবিক দ্রবীভূত অক্সিজেন লেবেল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়। ফলে হাওরে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ ও জলজ প্রাণী ব্যাপকভাবে মারা যায়।
পচা ধান ও মরা মাছের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো হাওর এলাকায়। হাওরের দূষিত পানি নদীর পানির সাথে মিশে যাওয়ায় নদীতেও মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল। হাওরের পানি ব্যবহারের অনপযোগী হয়ে পড়েছিল। এটি হাওর এলাকার জীব বৈচিত্র্যের জন্যও ছিল একটি বড় ধাক্কা। বাস্তুসংস্থান ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
মাছ মরে যাওয়ার কারণে ফসল হারানো কৃষকের মতো হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীরাও চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিলেন। ২০১৭ সালের মতো এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালেও হাওরবাসীর জন্য এক নির্মম বিপর্যয় নেমে আসে।অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।
ধান ও মাছেই হাওরবাসীর ভরসা। ২০১৭ সালে হাওরের ধান পচে অ্যমোনিয়া গ্যাস সৃষ্টির ফলে যেভাবে মাছ ও জলজ প্রাণীর বিনাশ হয়েছিল,এবছরও এমনই ভয়ানক পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তাই জলজ প্রাণী ও মাছের মড়ক ঠেকানোর লক্ষ্যে বিপর্যয় শুরুর পূর্বেই আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন সচেতন হাওরবাসী।
হাওর বাঁচা আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন,"২০১৭ সালে হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে ফসল ডুবির ফলে ধান পচে হাওরে এক ধরনের গ্যাস সৃষ্টি হয়ে মাছের ভয়ানক মড়ক দেখা দিয়েছিল। ফলে আমাদের হাওরের জলজ প্রাণী ও মাছের বিশাল ক্ষতি হয়েছিল। এবছরও হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ধান পচে মাছের মড়ক দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই সংকট মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ কমিয়ে আনা সম্ভব।আশা করি অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই মৎস্য অধিদপ্তর হাওরের এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় আগাম জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। "
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মীর রেজা বলেন, "এবছর অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ধান পচে জলজ প্রাণী ও মাছের মড়ক দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।২০১৭ সালেও হাওর তলিয়ে ধান পচে জলজ প্রাণী ও মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল। তাই এ ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার পূর্বেই হাওরের পানির অক্সিজেন ও ক্ষারত্বের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পানির রঙ পরিবর্তন বা মাছকে অস্বাভিকভাবে উপরে ভাসতে দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। জলজ প্রাণী ও মাছের মড়ক মোকাবিলায় মৎস্য অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ পূর্ব থেকে নিয়ে রাখতে হবে। হাওরপাড়ের মানুষকেও এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।"
হাওরের মাছ আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জেলা মৎস্য অফিস থেকে জানা যায়, "সুনামগঞ্জে ছোট - বড় ১০৯৫ বিল/জলাশয় এবং ১১ টি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। গত বছর হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। "
জলবায়ু পরিবর্তনের এই দুঃসময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি রোখা সম্ভব না হলেও, আগাম সঠিক প্রস্তুতি ও সতর্কতার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও হাওরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে জলজ প্রাণী ও মাছকে অকাল মড়কের হাত থেকে রক্ষা করে হাওরের প্রাণবৈচিত্র্য সজীব রাখতে।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]