২১ জুলাই ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / দুর্যোগ

মৌলভীবাজারের বন্যায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি, পুনর্বাসনের দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের

প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

প্রকাশঃ ২০ জুলাই, ২০২৬ ৩:৪৮ অপরাহ্ন


সাম্প্রতিক বন্যায় মৌলভীবাজারে কৃষি, মৎস্য, সড়ক যোগাযোগ ও নদী প্রতিরক্ষা অবকাঠামো মিলিয়ে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাব করেছে জেলা প্রশাসন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা। বন্যার পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছেন। একই সঙ্গে নদীর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মনু ও ধলাই নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এতে রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার সদরসহ পাঁচ উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।


প্রাথমিক হিসাবে, এ বন্যায় প্রায় চার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের বসতঘর পানিতে তলিয়ে যায়, কেউ কেউ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।


বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। মাঠের আউশ ধান, আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ প্রায় ৪০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, এ খাতে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।


কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, উপজেলার প্রধান অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে গ্রীষ্মকালীন টমেটো, আউশ ধান ও আমনের বীজতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। তার হিসাবে, শুধু কমলগঞ্জ উপজেলাতেই প্রায় দুই কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ২০০ কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।


বন্যায় সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে সড়ক অবকাঠামো। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে পাঁচটি সেতু ও কালভার্ট। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।


রাজনগর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাজু চন্দ্র পাল বলেন, শুধু তার উপজেলাতেই সড়ক অবকাঠামোর প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই কোটি টাকা।


কমলগঞ্জ উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. সাইফুল আজম বলেন, উপজেলায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।


এদিকে বন্যার পানিতে জেলার ৪০৫টি পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে মনু ও ধলাই নদীর পাঁচটি স্থানে ভাঙন এবং বিভিন্ন বাঁধে ফাটল ধরায় নদী প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতেও প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।


রাজনগরের উজিরপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, বন্যায় তার ঘরের ক্ষতি হয়েছে, ভেসে গেছে হাঁস-মুরগিও। বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। এখন নতুন করে ঘর মেরামত করার সামর্থ্যও নেই।


একই এলাকার জয়নাল মাস্টার বলেন, তাদের বাড়ি থেকে মনু নদীর বাঁধ বেশ দূরে হলেও পানির চাপে বাড়ির পাশেই ভাঙন দেখা দেয়। এতে ঘরবাড়ি ও গৃহস্থালির জিনিসপত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভাঙা বাঁধ। আবার বৃষ্টি হলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে।


কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের মকাবিল এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, নদীভাঙনে তার বাড়ি এখন ঝুঁকির মধ্যে। বাঁশ দিয়ে কোনোভাবে ঘরটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় সেটি নদীতে বিলীন হতে পারে। নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তার নেই।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তঘেঁষা মকাবিল এলাকায় মনু নদীর ভাঙন ঠেকাতে প্রতিবারই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত হলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

মৌলভীবাজার বন্যা, মৌলভীবাজার ক্ষয়ক্ষতি, রাজনগর বন্যা, কমলগঞ্জ বন্যা, মনু নদী, ধলাই নদী, মৌলভীবাজার কৃষি ক্ষতি, সড়ক ক্ষতি, মৎস্য খাত ক্ষতি, বন্যা পুনর্বাসন, পাহাড়ি ঢল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ