১১ জুলাই ২০২৬

মানবিকতা

এক প্লেট বিরিয়ানি ও একটি ভিডিও, দুই বছর পর মায়ের কাছে ফিরল সিয়াম

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১১ জুলাই, ২০২৬ ৫:৩১ অপরাহ্ন

ছবিঃ দীর্ঘ দুই বছর পর মায়ের হাটে ভাত খাচ্ছেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণ সিয়াম

‘বিরিয়ানি খাওয়াবেন?’ অপরিচিত একজন মানুষকে দেখেই এটুকুই বলেছিল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণ সিয়াম। সেই ছোট্ট আবদার পূরণ করতে গিয়ে কেউ হয়তো কেবল একটি খাবার কিনে দিতে পারতেন। কিন্তু সেই বিরিয়ানির প্লেটই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল দুই বছর ধরে নিখোঁজ এক ছেলেকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সেতুবন্ধন।


কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বাসিন্দা সিয়ামের (১৮) গল্পটি যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারের এক বিরল উদাহরণ। এক প্লেট বিরিয়ানি, একটি ভিডিও আর একজন শিক্ষকের মানবিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে দুই বছর পর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়েছে এই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণের।


পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় দুই বছর আগে বাবা মাহাবুলের মৃত্যুর দেড় মাস পর একটি ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে নিখোঁজ হয় সিয়াম। এরপর আত্মীয়স্বজন অনেক খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। একসময় সে ঘুরতে ঘুরতে সুনামগঞ্জ সদরে চলে আসে। পরে দিরাই উপজেলার শ্যামারচর বাজার এলাকায় অবস্থান করছিল।


কয়েকদিন আগে শ্যামারচর বাজারে সিয়ামের সঙ্গে দেখা হয় ব্রজেন্দ্রগঞ্জ রামচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর মোজাম্মেল হকের। প্রথম দেখাতেই সিয়াম তার কাছে বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছার কথা জানায়।


মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ওকে দেখে আমার মায়া হলো। বিরিয়ানি খেতে চেয়েছিল, তাই নিয়ে গিয়ে খাওয়ালাম। পরে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও করে ফেসবুক ও টিকটকে পোস্ট করি। ভাবিনি, এই ভিডিওই ওকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে।’


ভিডিওটি প্রকাশের পরদিনই সিয়ামের বড় চাচাতো ভাই সেটি দেখে মোজাম্মেল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিচয় নিশ্চিত করতে পরিবারের সদস্যরা সিয়ামের ছবি পাঠান। সবকিছু মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের সুনামগঞ্জে আসতে বলা হয়।


পরদিন কিশোরগঞ্জের নিকলী থেকে সিয়ামের মা সাথি বেগম, বোন ও স্বজনেরা শ্যামারচর বাজারে পৌঁছান। এর আগে মোজাম্মেল হক সিয়ামকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গোসল করান, চুল কেটে দেন এবং নতুন করে খাবারের ব্যবস্থা করেন।


এরপর আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। প্রায় দুই বছর পর মাকে সামনে দেখে সিয়াম তাকে চিনে ফেলে। মাকে জড়িয়ে ধরে থাকে দীর্ঘক্ষণ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভাই-বোন ও স্বজনদের চোখেও তখন আনন্দ আর আবেগের অশ্রু। উপস্থিত অনেকেই সেই দৃশ্য দেখে কান্না সামলাতে পারেননি।


মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পুনর্মিলনের পর তাদের সবাইকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাই। রাতে থাকার ব্যবস্থা করি। পরদিন সকালে নৌকায় করে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার ব্যবস্থা করে দিই। এর আগেও একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলাম। ভবিষ্যতেও পথ হারানো ও অসহায় মানুষদের পরিবারে ফিরিয়ে দিতে কাজ করতে চাই। এজন্য সমাজের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’


শ্যামারচর বাজারের ব্যবসায়ী কবির আহমেদ ও ইসমাইল আহমেদ ইমন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেকেই শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। কিন্তু মানবিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে এটি মানুষের জীবনেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সিয়ামের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের ঘটনাটি তারই প্রমাণ।


ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত সিয়ামের মা সাথি বেগম বলেন, ‘আমরা তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম, আর কোনো দিন ছেলেকে খুঁজে পাব না। আল্লাহর রহমত আর স্যারের মানবিক উদ্যোগের কারণেই আজ আমার ছেলে আবার আমার কাছে ফিরে এসেছে। তার এই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।’


এক প্লেট বিরিয়ানি হয়তো কারও কাছে শুধু একটি খাবার। কিন্তু সিয়ামের জীবনে সেটিই হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া পথ থেকে আপনজনের কাছে ফিরে আসার গল্প—যে গল্প মনে করিয়ে দেয়, সামান্য মানবিকতা কখনো কখনো বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের পুরো পৃথিবী।


শেয়ার করুনঃ

মানবিকতা থেকে আরো পড়ুন

সিয়াম, নিখোঁজ তরুণ, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, মোজাম্মেল হক, সুনামগঞ্জ, নিকলী, কিশোরগঞ্জ, বিরিয়ানি, মানবিক গল্প, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক ভিডিও, টিকটক, পরিবারে ফেরা, শ্যামারচর, দিরাই

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ