০৫ জুলাই ২০২৬

অনুসন্ধান

ছদ্মনামে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, নিরাপদ রুট জকিগঞ্জ সীমান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৫ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ন


‘বিচি’, ‘বোতাম’, ‘মাল’-এই তিনটি শব্দ সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকার মাদক কারবারিদের কাছে ইয়াবার সাংকেতিক নাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে প্রকাশ্যেই এসব শব্দ ব্যবহার করে চলে ইয়াবার চালান আদান-প্রদান। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো কেবল একেকটি ‘শব্দ’ মনে হলেও, বাস্তবে এসব শব্দ ব্যবহার করে চলছে কোটি টাকার মাদক ব্যবসা।


ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়তই দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবার চালান। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এই মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝে মধ্যে ইয়াবার চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যারা আটক হচ্ছেন তারা বেশিরভাগই মাদকের চালানের বাহক। 


কিছুদিন ধরে সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানে কারণে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে চোরাকারবারিরা। তবে কৌশল পাল্টে ধারা অব্যাহত রেখেছে মাদককারবারিরা। গত মাসে জেলার জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় পুলিশের অভিযানে বেশ কয়েকটি েইয়াবার চালান জব্দ করা হয়েছে। 


স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত সুরমা-কুশিয়ারা নদী সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে ইয়াবা পাচারের জন্য। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে জিরা, কসমেটিক্স ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান আলোচনায় থাকায় ইয়াবা পাচারের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে। সেই সুযোগে গড়ে ওঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট।


স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, অভিনব কৌশলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে। দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে চালান সংগ্রহ করা হয়। ভারতের অংশ থেকে বিশেষভাবে মোড়ানো প্যাকেটে ইয়াবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত চিহ্ন দেখে বাংলাদেশের সহযোগীরা মাঝনদী থেকে সেই প্যাকেট উদ্ধার করেন।


অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে কখনো সাঁতার কেটে ও কখনো সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ইয়াবা দেশে আনা হয়। পরে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ীভাবে মজুত করা হয়।


জানা গেছে, সীমান্ত পার হওয়ার পর ইয়াবার চালান প্রথমে স্থানীয় বাহকদের হাতে যায়। এরপর জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন বাজার ও নির্দিষ্ট পয়েন্টে বড় কারবারিদের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।


স্থানীয় সূত্র জানায়, সিলেটের বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীর বেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় ইয়াবার চালান। ঝুঁকির আশঙ্কা থাকলে বাহকরা যাত্রাপথ পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা নতুন বাহক ব্যবহারের কৌশলও গ্রহণ করেন। এতে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও অনেক সময় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।


অভিযানে ধরা পড়ছে বাহক, ধরাছোয়ার বাইরে মূলহোতা

গত জুন মাসে জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। গত ১৩ জুন বিয়ানীবাজার থানাধীন দুবাগ ইউনিয়নের পাঞ্জিপুরী এলাকায় চেকপোস্ট পরিচালনা করে যাত্রীবাহী বাস হতে ৯ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করেছে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ। এসময় একজনকে আটক করা হয়েছে। গত ১৫ জুন জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউপির শাহজালালপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ১ হাজার পিস ইয়াবা ও ১টি মোটরসাইকেল জব্দ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এসময় দু’জন বাহক পালিয়ে যায় বলে জানায় পুলিশ। 


গত ২৫ জুন জকিগঞ্জের খলাছড়া ইউনিয়নের জকিগঞ্জ-শেওলা সড়কে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ জুন জকিগঞ্জের মানিকপুর ইউনিয়নের খাসেরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ। 


পুলিশের অভিযানে এসব মাদকের সঙ্গে যাদের আটক করা হয়, তারা কেউই মূলত মাদক ব্যবসায়ী না। মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে। 

 

একটি সূত্র বলছে, ভারত থেকে ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করানো থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌছানো পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু কারবারি রয়েছেন। তারা কখনও ধরাছোঁয়ার মধ্যে পড়েন না। যারাই আটক হন তারা মূলত বাহক। প্রতিটি চালান সফল হলে তাদেরকে মজুরি দেওয়া হয়। 



সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোহাম্মদ যাবের সাদেক বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে। গতমাসে জকিগঞ্জ থেকে ১০ হাজার ও বিয়ানীবাজার থেকে ৯ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। 


তিনি বলেন, মাদকের চালানের সঙ্গে শুধু বাহক ধরা পড়ছে এমন না, যারা কারবারি তারাও আটক হচ্ছেন। এছাড়াও যারা মাদকের তালিকাভুক্ত কারবারি তাদের বিষয়ে আমাদের নজরদারি রয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন

মাদক, সিলেট, নেশা, মাদক কারবার, সীমান্ত

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ