প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাচ্ছে হাওরাঞ্চল
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২২ এপ্রিল, ২০২৬ ২:১৫ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল একসময় ছিল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র। বিস্তীর্ণ জলরাশি, দেশীয় মাছ, অতিথি পাখি আর ধানভিত্তিক কৃষি সব মিলিয়ে এটি ছিল প্রকৃতির এক অনন্য সমন্বয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। ধরিত্রী দিবসে দাঁড়িয়ে পরিবেশকর্মীরা বলছেন, হাওরের পরিবেশগত পরিবর্তন এখন আর ধীরগতির নয়, বরং দৃশ্যমান ও উদ্বেগজনক।
সরকারি সংস্থা ও গবেষণা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ধরন ও সময়কাল আগের তুলনায় বদলে গেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি এবং অল্প সময়ে ভয়াবহ বন্যার ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা হাওরের স্বাভাবিক জলচক্রকে ব্যাহত করছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ধরন পরিবর্তন এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি হাওরের ভেতরে ও আশপাশে অপরিকল্পিত সড়ক, বাঁধ এবং অবকাঠামো নির্মাণ প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক স্থানে খাল ও জলপ্রবাহ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে।
হাওরের জীববৈচিত্র্যেও এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এক দশক আগেও যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ সহজলভ্য ছিল, এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। বিশেষ করে ছোট মাছের প্রজাতি যা হাওরের খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে জলজ উদ্ভিদ ও অতিথি পাখির আগমনও কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও সদর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ঘুরে দেখা যায়, অনেক জায়গায় আগের মতো বিস্তীর্ণ জলরাশি নেই। কোথাও কোথাও বসতি ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে হাওরের স্বাভাবিক জলভাগ সংকুচিত হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নামার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ফসল ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
হাউস এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, হাওরের কৃষি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিনির্ভর। তাই পানির অস্বাভাবিক ওঠানামা সরাসরি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। কোথাও অতিবৃষ্টি ও ঢলে ফসল ডুবে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানি স্বল্পতায় জমি প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে কৃষকের আয় অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। হাওরের এই পরিবর্তন শুধু স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েরও একটি বড় ইস্যু। কারণ দেশের ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। পাশাপাশি হাওরের জীববৈচিত্র্য ও জলসম্পদ জাতীয় পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হাওরের স্বকীয়তা আরও দ্রুত হারিয়ে যাবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ, খাল পুনঃখনন এবং পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, বিগত সময়ে মানুষ ইচ্ছেমতো পরিবেশের ক্ষতি করেছে তবে আমরা এবার কঠোর হয়েছি। অবৈধভাবে মাটিকাটা, জলাশয় ভরাট, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কর্মকাণ্ড করতে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া আইন অমান্য করে যদি কেউ পরিবেশের ক্ষতি করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ, হাওরাঞ্চল, ধরিত্রী দিবস, পরিবেশ