২৩ এপ্রিল ২০২৬

খেলাধুলা-বিনোদন / খেলাধুলা

অর্থসংকটে থমকে যেতে বসেছে কলাগাঁওয়ের মেয়েদের ফুটবল

আবির হাসান মানিক, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ২:০৮ অপরাহ্ন


ছুটির ঘন্টা শোনা মাত্র শিক্ষার্থীরা যে যার মতো করে বাড়ির পথ ধরেছে। এরমধ্যে কিছু শিক্ষার্থী বাড়ি না ফিরে জার্সি গায়ে ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। সঙ্গে প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছে একজন ক্লাস টিচার। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, হয়তো ছেলেদের একটি ফুটবল টিম প্রাকটিস করছে। কিন্তু না, এটি আসলে মেয়েদের একটি ফুটবল টিম।

বলা হচ্ছিল সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা কলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অদম্য মেয়েদের কথা। কলসিন্দুরের মেয়েরা ফুটবলে যেমন দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এদিকে কলাগাঁও স্কুলের মেয়েরা জেলায় অনূর্ধ্ব-১২ ফুটবলে অনেকটাই অপ্রতিরোধ্য। এ যেনো আরেক কলসিন্দুর হয়ে উঠার প্রয়াস।

নানা প্রতিকূলতা, কাছের মানুষদের কটু কথা ও বাঁকা চক্ষু উপেক্ষা করে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তাঁরা অনূর্ধ্ব-১২ স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলছে। জেলায় পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নও তাঁরা। রয়েছে বিভাগীয় পর্যায়ে তিনবার রানারআপ হওয়ার গৌরব। বড়দের এসব অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কাঠফাটা রোদে ঘাম জড়াচ্ছে বর্তমানে অধ্যয়নরত মেয়েরা। কিন্তু প্রাকটিসে মেয়েদের চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে কোনো এক অজানা শঙ্কা যেন ভর করেছে তাঁদের। 

জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় ইউনিয়ন ভিত্তিক সেরা হয়ে ধাপে ধাপে বিভাগীয় শ্রেষ্ঠত্ব দখলের লড়াইয়ে অংশ নিতে হয়। একাজে শিক্ষা অফিসের বরাদ্দ নিতান্তই অপ্রতুল। যা বরাদ্দ পান তা দিয়ে জেলা পর্যন্ত মেয়েদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া আর হয়ে উঠেনা। পরে আবার বিভাগীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ। যা উভয়সঙ্কট তৈরির মতো অবস্থা। না টুর্নামেন্ট ছাড়তে পারে, না পারে এতো টাকা ব্যয় বহন করতে। তবে এসব অদম্য মেয়েরা কোন বাঁধায় আটকে থাকেনি, থাকতে চাইও না। 

কিন্তু এবার পরিস্থিতি যেন একেবারেই ভিন্ন। স্কুল প্রধান যেখানে নিজেই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে অনীহার কথা তুলে ধরেন। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে বরাদ্দ দেন তা দিয়ে বিভাগীয় পর্যন্ত লড়ে আসা কঠিন। নিরুপায় শিক্ষক বিগত দিনে মেয়েদের আগ্রহ ও স্কুলের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভেবে স্থানীয় বিত্তশালীরদের কাছ থেকে, আবার কখনো ধারদেনা করে পথ পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু এবার যেন আর কুলাচ্ছে না।

স্থানীয় সচেতন কিছু অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের মেয়েগুলোর বেশিরভাগ পরিবারই দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। অভিভাবকরা এমনিতেই মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে অনীহা। তার উপর মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করাটা যেন প্রত্যাশিত না। বরং এ যেনো মেয়েকে ঘরে আটকে রাখার দারুণ যুক্তি হয়ে উঠে তাঁদের কাছে। তবে শিক্ষকদের আবেদনের মুখে কিছু অভিভাবক যদিও মেয়েদের খেলতে অনুমতি দেন কিন্তু আর্থিক সহায়তার অভাবে অভিভাবক-শিক্ষক সবাই যেন আজ নিরুৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। 

তাহিরপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব সাকিব মুন খোকন বলেন, অজপাড়াগাঁয়ের অদম্য এই মেয়েগুলো হাল ছাড়তে নারাজ। বড়দের সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র বাসনা রয়েছে তাদের মনে। একাজ প্রমাণে প্রতিভা ও পরিশ্রমের ঘাটতিও নেই। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা। আর তা পেলে হয়তো আরেক কলসিন্দুর গ্রামের প্রতিরূপ হয়ে উঠতে পারে এরা। 

কলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আতিকুল ইসলাম তিনি  এ প্রতিবেদককে বলেন, মেয়েরা যেভাবে সব বাঁধা উপেক্ষা করে ফুটবল উন্মাদনায় মেতেছে তা দেখে উৎসাহিত না হয়ে পারি না। তবে যে পরিমাণ বরাদ্দ আসে তা দিয়ে ফুটবলটা এতদূর পর্যন্ত নিয়ে যা-ও যেন রুপকথার গল্পের মতো শোনায়। করনীয় বুঝে উঠতে পারছি না। এসময় তিনি এ অঞ্চলের মেয়েদের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) শাহরুখ আলম শান্তনু বলেন, কলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের ফুটবলে সাফল্যের কথা জেনেছি। আর্থিক সংস্থানের অভাবে মেয়েদের ফুটবলের জয়যাত্রা যেনো না থামে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


শেয়ার করুনঃ

খেলাধুলা-বিনোদন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, তাহিরপুর, খেলাধুলা, ফুটবল

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ