১৪ মার্চ ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য / ঐতিহ্য

কাজীটুলা জামে মসজিদ

ইসলামিক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এক অনন্য স্থাপনা

মিফতা হাসান

প্রকাশঃ ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:৪০ অপরাহ্ন


ছয় বছর আগেও সাধারণ একটি মসজিদে নামাজ আদায় করতেন এলাকার মুসল্লিরা। ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানও হতো স্বাভাবিক নিয়মে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদকে ঘিরে আধুনিকায়নের চিন্তা জায়গা করে নেয় এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে। সেই চিন্তা থেকেই শুরু হয় পুননির্মাণ কাজ। দীর্ঘ ছয় বছরের প্রচেষ্টায় শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি–পেশার বাসিন্দাদের সহযোগিতায় মসজিদটি এখন রূপ নিয়েছে দৃষ্টিনন্দন এক স্থাপত্যে। 

‎একদিকে সমসাময়িক ইসলামিক রীতিনীতি অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নকশা- যা মসজিদকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয় এবং নান্দনিক। ইসলামিক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় নির্মিত এ মসজিদটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে মুসল্লিরা স্থাপত্যের মধ্য দিয়েই মহান আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হতে পারেন।

দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটি সিলেট নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের কাজীটুলা এলাকায় অবস্থিত ‘কাজীটুলা জামে মসজিদ’। সম্প্রতি আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয়েছে মসজিদের। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পবিত্র রমজান উপলক্ষে এলাকার মুসল্লিদের কথা চিন্তা করে প্রথম রমজানের দিন (১৯ ফেব্রুয়ারি) মাগরিবের নামাজের মধ্য দিয়ে মসজিদটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এদিকে উদ্বোধনের পর থেকেই পথচারী, দর্শনার্থী ও স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে মসজিদটির স্থাপত্য নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে । 

‎মসজিদ কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত মসজিদটির আয়তন প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুট। মসজিদের প্রতিটি ফ্লোরে একসঙ্গে প্রায় ৬০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে এ মসজিদের পুনর্নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছরের কাজ শেষে সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ কিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনও মসজিদের অধিকাংশ কাজ বাকী রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
‎‎
‎জানা গেছে, মসজিদের প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিল ‘আলোয় আর্কিটেক্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মসজিদটি নির্মাণে কেন্দ্রে কাঠের স্তম্ভগুলোকে বৃক্ষাকৃতির কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়েছে। যা এর নকশার প্রধান আকর্ষণ। স্থপতিরা একে আখ্যা দিয়েছেন ‘তাওহীদের ছায়া’ নামে। 

‎স্থপতি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মসজিদটি নির্মাণ করতে প্রতিষ্ঠানটি ইসলামিক জ্যামিতিক নকশা, খিলান ও প্রতীকী উপাদান ব্যবহার করেছে। তাছাড়া সিলিংজুড়ে ইসলামিক অনুপ্রাণিত জ্যামিতিক প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে মসজিদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থপতি ওই প্রতিষ্ঠানটি।
‎ 
‎এদিকে মসজিদের ভেতরের পরিবেশকে শীতল ও মসৃণ রাখতে দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে মার্বেল পাথরের ক্ল্যাডিং। একইসঙ্গে প্রবেশদ্বার ও সিলিংয়ে ইসলামিক জ্যামিতিক মোটিফ প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামিক ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত রূপকে তুলে ধরা হয়েছে।

‎স্থপতিদের ভাষায়, মসজিদটি শুধুমাত্র ইট-পাথরের আদলে তৈরি কোন স্থাপনা নয়। এটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার একটি অবকাঠামো। তাই এর নকশায় উপাদান ও আলোর উৎসগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে মসজিদে প্রবেশ করেই মুসল্লিরা সম্পূর্ণ কোলাহল মুক্ত থাকতে পারেন। যাতে করে ইবাদতে কোনো প্রকার সমস্যার সৃষ্টি না হয়। 

‎আলোয় আর্কিটেক্ট প্রতিষ্ঠানের পার্টনার ফারাহ মুনিয়াত আবদুল্লাহ সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘ছাদের জ্যামিতিক প্যাটার্ন ইসলামিক জ্যামিতির সমসাময়িক পুনর্ব্যাখ্যা। পুনরাবৃত্ত নকশা আধ্যাত্মিক অসীমতার ধারণা প্রকাশ করে। মিহরাব সংযত রেখে আলো ও ফর্মের মাধ্যমে একটি স্বাভাবিক ফোকাল পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে।’

‎প্রতিষ্ঠানের আরেক পার্টনার আবু সায়েদ চৌধুরী বলেন, ‘মসজিদের কেন্দ্রে কাঠের স্তম্ভগুলোকে বৃক্ষাকৃতির বিম-স্ট্রাকচারে রূপ দেওয়া আমাদের নকশার প্রধান রূপক। এটি ‘তাওহীদের ছায়া’র প্রতীক—এক কেন্দ্র থেকে বিস্তার, যেমন একটি উম্মাহ এক কিবলার দিকে সংহত। কাঠের উষ্ণতা ও কোমল আলো পরিবেশকে শান্ত করেছে।’

‎মসজিদ কমিটির সদস্য ও পুনর্নির্মাণ অবকাঠামো কমিটির সভাপতি এবং ১৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রাশেদ আহমেদ সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে এলাকার শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষের সহযোগিতায় মসজিদটি পুনঃনির্মিত হয়েছে।’ তিনি দীর্ঘ ছয় বছর ধরে সহযোগিতা করা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বাকি কাজ সম্পন্ন করতেও সবার সহায়তা কামনা করেন।


শেয়ার করুনঃ

ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন

কাজীটুলা জামে মসজিদ, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, মসজিদ, তাওহীদের ছায়া, ইসলামিক ঐতিহ্য

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ