১৭ এপ্রিল ২০২৬

অভিবাসন

‘কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হবে’: যুদ্ধের মাঝেও রাস্তায় অভিবাসী শ্রমিকরা

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ১৩ মার্চ, ২০২৬ ৩:১৭ অপরাহ্ন


ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন লাখো অভিবাসী শ্রমিক। জীবনঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই, কারণ কাজ না করলে আয়ও নেই।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রতিদিন কাজে বের হচ্ছেন।

দুবাইয়ের এক পাকিস্তানি ডেলিভারি রাইডার বলেন, “আমি এখানে টাকা রোজগারের জন্য এসেছি। এখন যেকোনো পরিস্থিতিতেই কাজ করা আমার জন্য প্রয়োজন হয়ে গেছে। অনেক মানুষ ভয় পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের সাহস করে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কারণ আমি প্রতিটি ডেলিভারির জন্য টাকা পাই। কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হতে পারে।”

সম্প্রতি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত বেসামরিকদের সবাই ছিলেন বাংলাদেশ, নেপাল বা পাকিস্তানের অভিবাসী শ্রমিক।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ৫৫ বছর বয়সী সালেহ আহমেদ। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন সংযুক্ত আরব আমিরাতে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে তিনি নিহত হন।

মানবাধিকার সংগঠন ইকুইডেমের নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা কাদরি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা থেকে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে এসব বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাচ্ছেন না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত বৈষম্য। নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডেলিভারি খাতসহ উপসাগরীয় অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে হামলার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

বিশেষ করে ডেলিভারি কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। কারণ সাধারণ মানুষ ঘরে অবস্থান করলেও প্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবার সরবরাহ করতে তাদের রাস্তায় থাকতে হচ্ছে।

দুবাইয়ে কাজ করা এক বাংলাদেশি ডেলিভারি রাইডার জানান, প্রথম হামলার দিন রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা ছিল। তবে পরদিন থেকেই তিনি আবার ডেলিভারি দিতে বের হন। যদিও অনেক গ্রাহক তখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি টিপস দিচ্ছিলেন।

আবুধাবিতে কর্মরত আরেক পাকিস্তানি রাইডার বলেন, হামলার পরবর্তী দিনগুলোতে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। অনেক মানুষ ঘর থেকে বের না হয়ে খাবার ও নিত্যপণ্য অনলাইনে অর্ডার করতে শুরু করেন।

এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হামলার দৃশ্য ও প্রভাবের অনেক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যার বড় অংশই ধারণ করছেন অভিবাসী শ্রমিকরা। তবে এসব ভিডিও ধারণ করায় কেউ কেউ আইনি ঝুঁকিতেও পড়ছেন।

সম্প্রতি বাহরাইনে হামলার পর ভিডিও ধারণ করে তা প্রকাশ করার অভিযোগে পাঁচ পাকিস্তানি ও এক বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন এই অভিবাসী শ্রমিকরাই। অথচ তাদের নিজ নিজ দেশের সরকার থেকেও তেমন কার্যকর সহায়তা মিলছে না।

কাতারে বসবাসকারী এক অভিবাসী ব্যবসায়ী বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিকের জন্য এমন কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, “অনেকের জন্য দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নেই। তাই ভয় থাকলেও সবাই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”

যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার এই পরিস্থিতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনে ভয়, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা যেন নীরব বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাদের অনেকেই বলছেন, প্রতিদিন কাজ করতে বের হওয়ার সময় মাথার ওপর শেলের টুকরো পড়ার আশঙ্কা থাকলেও জীবিকার তাগিদে তা মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হচ্ছে।


শেয়ার করুনঃ

অভিবাসন থেকে আরো পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, মার্কিন–ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সংঘাত

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ