২৮ মে ২০২৬

বিশ্লেষণ

বিশ্লেষণ

ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই কেন বারবার রোগীর স্বজনদের মুখোমুখি?

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬ ১:০০ অপরাহ্ন


সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান। তৃণমূলের অসহায় রোগী ছাড়াও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত বিত্তশালীদের জন্যও এটি শেষ ভরসা। 


কিন্তু এই হাসপাতাল ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায়—তা হলো চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের অপ্রীতিকর ঘটনা। বিশেষ করে ইন্টার্ন বা শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গেই বারবার এরকম ঘটনা ঘটছে। 


পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, এখন কেবল বাগবিতণ্ডাতেই থামছে না কোনো পক্ষ। হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নিচ্ছে। 


প্রশ্ন ওঠছে, কেন এমন হচ্ছে? কেনইবা বারবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে? 


যেমন প্রশ্ন ওঠছে রোগীর স্বজনদের আচরণ নিয়ে, তেমন প্রশ্ন ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিয়েও। চিকিৎসক ও রোগীর স্বজন দু’পক্ষের মেজাজ হারানোর অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে হাসপাতালটির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। 


ওসমানী হাসপাতালে চাপ কতটা


হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যা ৯০০ কিন্তু বিপরীতে লোকবল আছে পূর্বের ৫০০ শয্যার হিসেবে। সেখানেও আছে ঘাটতি। অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিনই রোগী ভর্তি থাকেন তিন হাজারেরও বেশি।

 

ফলে একজন চিকিৎসককে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সেবা দিতে হয়। এতে চিকিৎসা দিতে দেরি হয়, সময় নিয়ে রোগীর স্বজনদের বোঝানো সম্ভব হয় না। এই অতিরিক্ত চাপই পুরো সমস্যার ভিত্তি তৈরি করছে। 


অতিরিক্ত চাপে যেমন চিকিৎসকরা মেজাজ হারান, তেমনি জরুরি রোগীদের চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে রোগীর স্বজনরাও মেজাজ হারান। বেশ কিছুদিন ধরে মেজাজ হারানোর সংস্কৃতি ওসমানী হাসপাতালে বিদ্যমান। 


দুই পক্ষের এই মেজাজ হারানোর কারণেই গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাতে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। যা এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।


এ ঘটনার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দাবি করছেন যে তাদের এক নারী সহকর্মীর উপর হামলা চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও এরকমটা দেখা গেছে। 


একইভাবে রোগীর স্বজনরাও দাবি করছেন, তাদেরকেও মারধর করা হয়েছে। যার প্রমাণও ভিডিওতে দেখা গেছে। যখন পুলিশ সদস্যরা রোগীর স্বজনদের তাদের হেফাজতে নেন, তখন একজনের কাপড় ছেড়া অবস্থায় ছিল। ওই সময় ইন্টার্ন চিকিৎকরাও ধাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার আগে রোগীর স্বজনদের অবরুদ্ধ করেও রাখা হয়। 


ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই কেন মুখোমুখি হচ্ছেন


গত বছরের ২৭ এপ্রিল। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকের বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে লাথি দিয়ে বসেন ওই চিকিৎসক। এই ভিডিওটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঘটেছিল দুপুর ১টার পরে। 


এর আগের বছর ২১ আগস্ট এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধর ও ভাঙচুর করে রোগীর স্বজনরা। সেই ঘটনাটাও ঘটে রাতে। ২০১৮ সালে মাকামে মাহমুদ মাহী নামে এক ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীর স্বজন কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। সেই ঘটনাও ঘটে রাতে। ধর্ষণের এই ঘটনাটি দেশজুড়ে তোলপাড় ছিল। 


সাম্প্রতিক বা বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ঘটনার শুরু হয় জরুরি বিভাগ বা ওয়ার্ডে ভর্তির সময়, রোগীর অবস্থা অবনতি কিংবা মৃত্যু ঘিরে। তারচেয়ে বেশি লক্ষ্যণীয়, প্রতিটি ঘটনাই যখন ঘটে, তখন ওয়ার্ডের সম্পূর্ণ দায়িত্বে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা থাকেন।  


ওসমানী হাসপাতালের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা ও রোগী ব্যবস্থাপনার বড় অংশ সামলান ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। অনেক সময় সিনিয়র চিকিৎসক সরাসরি ওয়ার্ডে উপস্থিত থাকেন না। বিশেষ করে দুপর ১টার পর থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই সব করেন। 


অভিযোগ আছে টপ লেভেল ও মিড লেভেল চিকিৎসকরা দুপুরের পর থেকেই প্রাইভেট মেডিক্যালে ব্যস্ত হয়ে যান এবং সন্ধ্যার পর সবারই প্রাইভেট চেম্বার প্র্যাকটিস থাকে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দীর্ঘ এ সময় মিড লেভেলের চিকিৎসকেদের সাথে মুঠোফোনে পরামর্শ নিয়েই চিকিৎসা সেবা দেন।


যার ফলে—রোগীর স্বজনদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় ইন্টার্নদের, গুরুতর সিদ্ধান্তের চাপও পড়ে তাদের ওপর। এতে করে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে আচরণে রুক্ষতা দেখা দেয়। এই রুক্ষ আচরণ বা ভুল বোঝাবুঝিই অনেক সময় মারামারির দিকে গড়ায়।


যোগাযোগের ঘাটতি থেকে ক্ষোভের সঞ্চার


চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের বড় অংশই আসে চিকিৎসক-রোগীর স্বজনের যোগাযোগের অভাব থেকে। রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর, কী ঝুঁকি আছে, চিকিৎসায় কত সময় লাগতে পারে—এসব বিষয় পরিষ্কার করে বলা হয় না। 


অধ্যাপক পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা যায় না বললেই চলে। ওয়ার্ডে রোগীদের ভিজিটের সময় রোগীর স্বজনদের বের করে দেওয়া হয়। ভিজিট পরে রোগীর অবস্থাও জানানো হয় না। চিকিৎসকদের কাছে এসব ব্যাখ্যা না পাওয়ার কারণে স্বজনদের ক্ষোভ জমে থাকে। 


কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সব সময় ওয়ার্ডে থাকায় রোগীর স্বজনরা তাদের কাছ থেকে রোগীর সার্বিক অবস্থা জানতে চান। তখন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জবাব না দিলে কিংবা যুক্তিসঙ্গতভাবে রোগীর অবস্থা বোঝাতে না পারলে পূর্বের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। 


যে কারণে বারবার একই ঘটনা ঘটছে


প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি বা বৈঠক হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জনবল সংকট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নিরাপত্তার ঘাটতি—এই মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে। ফলে সাময়িক উত্তেজনা থামলেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। এই সমস্যা সমাধানে  প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।


জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও নার্স সংখ্যা বাড়ানো, সার্বক্ষণিক সিনিয়র চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের যোগাযোগ ও সংকট মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করা ও  চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করলে এসব সমস্যার সমাধান হতে পারে। 


এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু একটি হাসপাতাল নয়, এটি পুরো সিলেট বিভাগের মানুষের আস্থার জায়গা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে চিকিৎসক–রোগীর স্বজন সংঘাতের সংস্কৃতি ভাঙা সম্ভব হবে না।


শেয়ার করুনঃ

বিশ্লেষণ থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, ওসমানী মেডিকেল, হাসপাতাল, চিকিৎসা, ইন্টার্ন,

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ