সুনামগঞ্জের নবগঠিত মধ্যনগর উপজেলা। একদিকে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল, অসংখ্য হাওর-বিল, নদী-খাল আর বিচ্ছিন্ন জনপদ নিয়ে গড়ে ওঠা এই উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ যোগাযোগের দিক থেকে এখনো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জীবনযাপন করতে হচ্ছে এখানকার প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে।

বছরের একেক মৌসুমে যোগাযোগের সংকটের ধরনও বদলে যায়। বর্ষায় পানি আর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই, শুষ্ক মৌসুমে কাদা, বালু ও ভাঙাচোরা সড়ক। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে এমন টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা কি মধ্যনগরে গড়ে তোলা সম্ভব নয়?

বর্ষায় দ্বীপ, শুষ্ক মৌসুমে দুর্গম জনপদ
হাওরাঞ্চলের মানুষের বসতি নির্মাণের ধরনই তাদের জীবন সংগ্রামের পরিচয় বহন করে। বন্যার পানি থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত উঁচু মাটির ঢিবিতে গুচ্ছাকারে বসতি গড়ে ওঠে, যা স্থানীয়ভাবে ‘হাটি’ নামে পরিচিত। বর্ষায় চারদিকে পানি থইথই করলে একেকটি হাটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যায়।

এ সময় নৌকা কিংবা ট্রলার  হয়ে ওঠে মানুষের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু হাওরের খোলা পানিতে বাতাসের তীব্রতায় সৃষ্টি হয় বিশাল ঢেউ স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আফাল’। এই আফাল ছোট নৌযান চলাচলকে করে তোলে ঝুঁকিপূর্ণ। কখনো মাত্র ৩০০-৪০০ ফুট দূরত্বের দুটি হাটির মধ্যে যাতায়াতও হয়ে ওঠে জীবন-মরণের বিষয়।

শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ ও অসুস্থ রোগীদের জন্য এ দুর্ভোগ আরও তীব্র। প্রসূতি মাকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। দুর্যোগের সময় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো, প্রশাসনের জরুরি কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছাতেও বাধার সৃষ্টি হয়।

বর্ষায় বাঁশের সাঁকো কিংবা ভাসমান ড্রাম সেতু দিয়ে সাময়িক যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তীব্র স্রোত ও আফালের আঘাতে এসব কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে প্রতি বছর একই সংকট নতুন করে ফিরে আসে।

শুষ্ক মৌসুমে আবার চিত্র বদলে যায়। পানি নেমে গেলে হাওরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে সাব-মার্সিবল সড়ক ও মাটির রাস্তা। তখন ভাড়ায় চালিত দুই চাকার যান মোটরসাইকেলই অনেক এলাকার মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু ভাঙাচোরা রাস্তা, বালুময় পথ, পর্যাপ্ত কালভার্ট ও সেতুর অভাব এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে যোগাযোগ থেকে যায় দুর্ভোগপূর্ণ। অর্থাৎ বর্ষায় পানি, শুষ্ক মৌসুমে রাস্তা দুই মৌসুমেই মধ্যনগরের মানুষের যোগাযোগ সংকট যেন অবিচ্ছিন্ন।

দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ
মধ্যনগরের মানুষের জীবন কেবল যোগাযোগ সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়; ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের। এপ্রিল-মে মাসে বোরো ধান যখন কৃষকের ঘরে ওঠার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই পাহাড়ি ঢল নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি মুহূর্তে প্লাবিত করতে পারে বিস্তীর্ণ ফসলি হাওর।টাঙ্গুয়ার হাওর, ইঁদুরকানি, এরানবিলসহ বড় বড় হাওরের কৃষকের কাছে এ সময়টি থাকে চরম উদ্বেগের। এর সঙ্গে রয়েছে কালবৈশাখী ও বজ্রপাতের ভয়। হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি ও খোলা প্রান্তরে বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কৃষক ও জেলেদের অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কিংবা পানিতে অবস্থান করেন। ফলে প্রতিবছরই বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

আবার প্রবল বাতাস ও আফালের আঘাতে হাওরপারের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও কোথাও বসতভিটা পর্যন্ত ভাঙনের মুখে পড়ে। এসব দুর্যোগের পর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়।

নদী হারাচ্ছে নাব্যতা, বিপাকে বাণিজ্য
মধ্যনগরের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নদীপথের গুরুত্ব অপরিসীম। কংস ও সোমেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদী ও খাল একসময় এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় নাব্যতা কমে গেছে।

নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেও পানি দ্রুত বেড়ে যায়। এতে কাঁচা ফসল রক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাওর ও লোকালয়ে পানি ঢোকার আশঙ্কা বাড়ে। আবার বর্ষা শেষে হেমন্তের শুরুতেই সোমেশ্বরী নদীর বিভিন্ন অংশ শুকিয়ে বিস্তীর্ণ চর জেগে ওঠে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাণিজ্যে। বছরের প্রায় তিন-চার মাস অনেক অংশে বড় বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদিত ধানসহ অন্যান্য পণ্য সরাসরি আড়তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। মাঝপথে একাধিকবার নৌযান পরিবর্তন ও পণ্য ওঠানামা করতে হয়। এতে সময় যেমন বাড়ে, তেমনি বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয়।

এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজার অর্থনীতিতেও। ঐতিহ্যবাহী মধ্যনগর বাজার, বিশেষ করে ধানের আড়তগুলো, এ সংকটের কারণে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। কৃষক উৎপাদন করলেও ন্যায্য পরিবহন সুবিধা না থাকায় বাজারজাতকরণে তাকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

দরকার প্রকৃতিবান্ধব যোগাযোগ পরিকল্পনা
মধ্যনগরের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রচলিত স্থলভিত্তিক যোগাযোগ পরিকল্পনা হুবহু প্রয়োগ করলে হবে না। হাওরের প্রকৃতি, পানির ওঠানামা, পাহাড়ি ঢল, আফাল এবং বর্ষা-শুষ্ক মৌসুমের ভিন্ন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে ‘মৌসুমভিত্তিক ও অভিযোজন যোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা’। অর্থাৎ এমন অবকাঠামো, যা বর্ষায় পানির সঙ্গে খাপ খাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে সড়ক যোগাযোগকে কার্যকর রাখবে।

প্রথমত, সোমেশ্বরীসহ অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত ড্রেজিং করা প্রয়োজন। তবে শুধু মাটি কেটে নদী গভীর করলেই হবে না; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, হাওরের পরিবেশ ও পলি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে ড্রেজিং করতে হবে। এতে নৌপথ সচল হওয়ার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ও কৃষি-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায় এমন সড়কে প্রচলিত সেতুর পরিবর্তে উপযোগী সাব-মার্সিবল কালভার্ট ও কজওয়ে নির্মাণ করা যেতে পারে। এসব কাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বর্ষার স্রোত নিরাপদে প্রবাহিত হতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে যান চলাচল করা যায়।

তৃতীয়ত, কাছাকাছি হাটিগুলোর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের জন্য কমিউনিটি খেয়া ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যেখানে উপযুক্ত, সেখানে তার বা চেইন-নিয়ন্ত্রিত নিরাপদ খেয়া ব্যবহার করা হলে মানুষের পাশাপাশি ছোট যানবাহনও পারাপার করা সম্ভব হবে। এ ব্যবস্থার পরিচালনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

চতুর্থত, খাল বা ছোট নদীর ওপর মৌসুমি যোগাযোগ নিশ্চিত করতে অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ স্থাপন করা যেতে পারে। পাহাড়ি ঢল বা বর্ষার পানি আসার আগে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সেতু খুলে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কমবে।

পঞ্চমত, যেসব নদী বা খালে সারা বছর পানি থাকে, সেখানে পানির উচ্চতা ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাসমান পন্টুন সেতু নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাজারকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

ষষ্ঠত, পরিবেশ ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত ছোট ফেরি বা ডেক ফেরি চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। খালের দুই পাশে স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে মানুষ ও মোটরসাইকেল পারাপারের ব্যবস্থা করা হলে দুর্গম এলাকার যোগাযোগ অনেকটাই সহজ হবে।

যোগাযোগ অবকাঠামো মানেই শুধু রাস্তা নয়
মধ্যনগরের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যোগাযোগ অবকাঠামো বলতে শুধু পাকা সড়ক কিংবা বড় সেতু বোঝায় না। একটি হাওরভিত্তিক জনপদের জন্য নৌপথ, জেটি, সেতু, কালভার্ট, কজওয়ে, ফেরি এবং মৌসুমি সড়ক সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।

বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোন হাটি থেকে কোন বাজার, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছানো যায় তার ভিত্তিতে একটি ‘কমিউনিটি কানেক্টিভিটি ম্যাপ’ তৈরি করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করা জরুরি। কারণ বাইরের দৃষ্টিতে যে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর মনে হতে পারে, হাওরবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতায় সেটি অনেক সময় টেকসই নাও হতে পারে।

বিচ্ছিন্নতা নয়, সংযোগই হোক উন্নয়নের ভিত্তি
মধ্যনগরের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষ। তারা কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাদের জীবন ও অর্থনীতি সচল রাখতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক প্রয়োজন।

একটি রাস্তা শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করে না; এটি একজন রোগীকে হাসপাতালের সঙ্গে, একজন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে, একজন কৃষককে বাজারের সঙ্গে এবং একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে।

তাই মধ্যনগরের যোগাযোগ সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করেই মধ্যনগরের মানুষের জন্য নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে হবে।

মধ্যনগরের মানুষ আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে থাকতে চায় না। তাদের প্রত্যাশা বর্ষায় নিরাপদ নৌপথ, শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর সড়ক, সারা বছর সচল বাজার ও জরুরি মুহূর্তে দ্রুত যোগাযোগ। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া গেলে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

মধ্যনগরের ৬০ হাজার মানুষের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন তাই কোনো একক উন্নয়ন প্রকল্প নয় এটি একটি জনপদের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি ও জীবন রক্ষার প্রশ্ন।

লেখক: প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা,মধ্যনগর,সুনামগঞ্জ।

[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]


শেয়ার করুনঃ