পাহাড় সবসময়ই মানুষকে টানে। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা, অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সাহস এই তিনের মিলনেই তৈরি হয় একটি প্রকৃত ট্রেকিং অভিযান। সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ট্যুরিস্ট ক্লাবের আয়োজনে সিলেট জেলার সর্বোচ্চ চূড়া তিন্দুই পাহাড় অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। 

প্রকৃতি, বন্ধুত্ব, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য অভিজ্ঞতা সবমিলিয়ে তিন্দুই পাহাড় অভিযান স্মৃতির ঝুলিতে কিছু অনিন্দ্য সুন্দর মুহুর্ত যোগ করে।

অভিযানের শুরু থেকেই ছিল এক অন্যরকম উত্তেজনা । সকাল সাতটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে সবাই একত্রিত হয়ে যাত্রা শুরু করি। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে আমরা প্রবেশ করি সবুজ পাহাড়, বনভূমি এবং গ্রামীণ জনপদের অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে। পথ যত সামনে এগিয়েছে, প্রকৃতির রূপ ততই নতুন নতুন বিস্ময় উপহার দিয়েছে।


ট্যুরিস্ট ক্লাব সাস্টের ফটোসেশন


অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের মোট ৩৬ জন শিক্ষার্থী। পুরো অভিযানে আমাদের সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ এবং জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট (জিইই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রনি বসাক। তাঁদের উপস্থিতি ও আন্তরিক সহযোগিতা পুরো অভিযানে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভ্রমণকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত করেছে।

সকাল নয়টার দিকে আমাদের বহনকারী লেগুনা এসে থামে লালাখাল ঘাটে। সেখানে পৌঁছে ট্যুরিস্ট ক্লাবের সদস্যরা অভিযানের উদ্দেশ্য, নিরাপত্তাবিধি ও করণীয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
সবার নির্দেশনা মেনে লালাখালের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিই। কয়েক মিনিটের নৌভ্রমণের পর পৌঁছে যাই বটতলা বাজার ঘাটে। সেখান থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে হবে তিন্দুই পাহাড়ে।


গ্রামের নাম নিশ্চিন্তপুর। নিশ্চিন্তপুরের গ্রামীণ আকাঁবাকা পথ ধরে আমরা হাঁটা শুরু করি। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা প্রবেশ করি নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের লীলাভূমি গঙ্গারজুম চা বাগানে। সারি সারি চা-গাছ, পাহাড়ি বাতাস আর চারপাশের সবুজে ঘেরা নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই মনকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হতে হতে একসময় এসে দাঁড়াই তিন্দুই পাহাড়ের পাদদেশে।


ট্রেকিংয়ে শিক্ষার্থীরা

এবার শুরু আসল পরীক্ষা।

তিন্দুই পাহাড়ে ওঠার পথ মোটেও সহজ নয়। সূর্য তখন ঠিক মাথার উপরে, কোথাও খাড়া উঁচু ঢাল, কোথাও পিচ্ছিল মাটির পথ, আবার কোথাও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে। শারীরিক পরিশ্রম ছিল অনেক, তবে দলের সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ট্যুরিস্ট ক্লাবের দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিটি চ্যালেঞ্জই আনন্দের অংশ হয়ে উঠেছিল। ক্লান্তি যত বেড়েছে, পাহাড়ের সৌন্দর্য যেন ততই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে।

পাহাড়ের মাঝামাঝি একটি মনোরম স্থানে আমরা দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি নিই। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর খোলা আকাশের নিচে, পাহাড়ি পরিবেশে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অনুভূতিটা ছিল অন্যরকম। সাধারণ খাবারও তখন অসাধারণ সুস্বাদু মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু হয় চূড়ার পথে আমাদের পদযাত্রা।

অবশেষে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন তিন্দুই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালাম, তখন চারপাশের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চারদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়ের সারি, দূরে  সীমান্তের উপারের পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের ভেলা আর নির্মল বাতাস, মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সেই মুহূর্তটিই ছিল পরিশ্রমের সবচেয়ে সুন্দর পুরস্কার।
চূড়ায় পৌঁছে দলের অনেকেই হ্যামক টানিয়ে দোল খেতে শুরু করল। কেউ প্রকৃতির কোলে নিশ্চিন্তে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল, কেউ মেঘে মোড়া পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছিল। আমি সেই দৃশ্যগুলো নীরবে উপভোগ করছিলাম, আর ক্যামেরায় বন্দি করছিলাম স্মরণীয় মুহূর্তগুলো।


ট্রেকিংয়ে শিক্ষার্থীরা

দিনের শেষ প্রান্তে সবাই একত্র হয়ে একটি গ্রুপ ছবি তুলি। সেই ছবির প্রতিটি হাসিমুখ যেন সফল অভিযানের সাক্ষী। এরপর শুরু হয় ফিরে আসার পথ। ফেরার সময় শরীরে ক্লান্তি থাকলেও মন ছিল পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে ভরা।

ফিরতি গাড়িতে বসে ভাবছিলাম, পাহাড় আমাদের শুধু সুন্দর কিছু দৃশ্যই উপহার দেয়নি, বরং শিখিয়েছে ধৈর্য, সাহস, দলগত বন্ধন এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক নতুন পাঠ।

যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজ করেন এবং ট্রেকিংয়ের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য তিন্দুই পাহাড় নিঃসন্দেহে একবার হলেও ঘুরে দেখার মতো একটি গন্তব্য।


তিন্দুই পাহাড়


৹ কীভাবে যাবেন তিন্দুই পাহাড়: 

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত তিন্দুই পাহাড়ে যেতে প্রথমে সিলেট শহর থেকে লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে সারিঘাট বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় লালাখাল ঘাট। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হয়ে বালিদাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তা ধরে গঙ্গারজুম চা বাগান অতিক্রম করে প্রায় সাত থেকে আট কিলোমিটার হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন সিলেট জেলার সর্বোচ্চ চূড়া তিন্দুই পাহাড়ে।

লেখক : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। 

[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]


শেয়ার করুনঃ