হাওরাঞ্চলে একটি শিশুর কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া মানে শুধু শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানো নয়; প্রতিদিন অনিশ্চয়তার সঙ্গে একটি নীরব সমঝোতা। বর্ষা এলেই তার যাত্রাপথ বদলে যায়। কাঁচা রাস্তা ডুবে যায়, বাড়ির উঠান মিলিয়ে যায় জলরাশিতে, আর বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ছোট্ট একটি নৌকা। কখনো ঢেউ, কখনো ঝোড়ো হাওয়া, কখনো বজ্রপাতের আশঙ্কা পেরিয়ে সে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি দেখে এক শিক্ষকই ছয়টি শ্রেণির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, কিংবা বিদ্যালয় ভবনই বছরের কয়েক মাস পাঠদানের অনুপযোগী, তখন স্পষ্ট হয়, এই শিশুর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ প্রকৃতি নয়; রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ব্যর্থতাই।

হাওরের শিক্ষাবঞ্চনাকে অনেক সময় ভৌগোলিক দুর্ভোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বাস্তবে এটি ভৌগোলিক সংকটের চেয়ে বেশি; রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। সমতলের জন্য তৈরি শিক্ষা কাঠামো হুবহু হাওরে প্রয়োগ করা হয়েছে, অথচ এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা, যোগাযোগব্যবস্থা, মৌসুমি বাস্তবতা কিংবা দুর্যোগের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বছরের কয়েক মাস যে জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, সেখানে একই শিক্ষা ক্যালেন্ডার, একই উপস্থিতির নিয়ম, একই শিক্ষক ব্যবস্থাপনা এবং একই প্রশাসনিক পদ্ধতি কার্যকর থাকবে- এমন ধারণা শুরু থেকেই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। সেই নীতিগত ভুলের মূল্য আজও দিচ্ছে হাওরের প্রজন্ম।

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাওরপাড়ের কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে বলেছেন, হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষক সংকট, বদলি নীতি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, স্কুল ফিডিং এবং জবাবদিহিতা নিয়ে তাঁর ঘোষণাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করাই কার্যকর সমাধানের প্রথম শর্ত। কিন্তু হাওরের মানুষ একই সঙ্গে আরেকটি সত্যও জানে- এই জনপদ প্রতিশ্রুতির চেয়ে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাসই বেশি দেখেছে।

এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রমাণ ২০১০ সালের ধর্মপাশার শৈলচাপড়া ট্রলারডুবি। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে আটজন শিক্ষার্থীসহ ১৬ জনের মৃত্যু পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তখন নিরাপদ নৌযান, শিক্ষার্থী পরিবহন এবং হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেড় দশক পরও বর্ষা নামলেই হাজারো শিশুকে একই ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। একটি জাতীয় ট্র্যাজেডিও যদি রাষ্ট্রকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক নয়; রাষ্ট্রচিন্তারও।

হাওরের শিক্ষা সংকটের গভীরতা বোঝার জন্য শুধু শিক্ষকসংকটের হিসাব দেখলেই চলবে না। দেখতে হবে শিক্ষার সুযোগ কতটা অসমভাবে বণ্টিত। সুনামগঞ্জে ১ হাজার ৪৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও এখনো ১৬৬টি গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই। মধ্যনগর উপজেলার ১৪৭টি গ্রামের মধ্যে ৬৩টিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে তার ঠিকানার ভিত্তিতে। এটি শুধু শিক্ষা খাতের ব্যর্থতা নয়; সমঅধিকারের সাংবিধানিক অঙ্গীকারেরও অপূর্ণতা।

এই বঞ্চনার প্রভাব শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যালয় দূরে হলে বা সেখানে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে উঠলে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। কেউ মাছ ধরায় যুক্ত হয়, কেউ মৌসুমি কৃষিশ্রমে নিয়োজিত হয়, আবার কেউ অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। তখন একটি শিশুর বিদ্যালয় হারানোর অর্থ শুধু একটি পাঠ্যবই হারানো নয়; সংকুচিত হয়ে আসে তার সম্ভাবনার পরিসর।

প্রতিমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে শিক্ষকসংকটে চ্যাম্পিয়ন সুনামগঞ্জ। বক্তব্যটি কিছুটা হাস্যরসিকতার প্রকাশ হলেও এটিই বাস্তব সত্য। এখানে বহু বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাই একাধিক শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে যেতে হয়। কোথাও প্রধান শিক্ষকের পদ বছরের পর বছর শূন্য, কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক কখনোই নিয়োগ পায়নি। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের জবাবদিহির প্রশ্ন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই সঙ্গে রাষ্ট্রকেও স্বীকার করতে হবে, কাঠামোগত সংকটকে ব্যক্তিগত দায় দিয়ে আড়াল করা যায় না।

নতুন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু হাওরের বাস্তবতা বলে, নিয়োগের মাধ্যমে সংকটের শুরুটা সামাল দেওয়া যায়; স্থায়ী সমাধান আসে শিক্ষককে ধরে রাখতে পারলে। দুর্গম বিদ্যালয়ে শিক্ষককে ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যোগদানের পর বদলির অপেক্ষাই অনেকের প্রথম লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ফলে শূন্য পদ পূরণ হয়, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে শূন্য হয়ে যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে হাওরের জন্য আলাদা শিক্ষক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে- হাওর ভাতা,কর্মস্থলে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, বাস্তবসম্মত বদলি নীতি এবং নির্দিষ্ট সময় দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ- শিক্ষকের প্রস্তুতি। হাওরের বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করা একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা সমতলের কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকের অভিজ্ঞতার মতো নয়। বর্ষাকালে একই কক্ষে একাধিক শ্রেণিকে পাঠদান, দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সীমিত উপকরণে কার্যকর পাঠদান- এসবই আলাদা দক্ষতা দাবি করে। তাই সুনামগঞ্জ পিটিআইয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা প্রশিক্ষক বাড়ালেই চলবে না; প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুকেও হাওরের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। হাওরের জন্য শিক্ষক তৈরি করতে হলে হাওরকে প্রশিক্ষণের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবেই দেখতে হবে।

কিন্তু সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে। প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকার 'হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)' প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার ১৬টি দুর্গম উপজেলায় বহুতল একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস-ছাত্রীনিবাস, শিক্ষক ডরমেটরি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা। প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হলে বর্ষাকালের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পেতে পারত। অথচ প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরই প্রকল্পটি কার্যত থেমে যায়। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, দীর্ঘদিন প্রকল্প পরিচালক না থাকা, দুর্বল তদারকি, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্বই এই স্থবিরতার প্রধান কারণ। এই অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করে, হাওরের উন্নয়নে অর্থের চেয়ে বাস্তবায়নের ঘাটতিই বড় বাধা।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়-সহনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা এবং কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও ১৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু হাওরের মানুষ বরাদ্দের ঘোষণা নয়, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সময়মতো বাস্তবায়িত একটি ছোট প্রকল্পের মূল্য অনেক সময় কাগজে থাকা বড় বরাদ্দের চেয়েও বেশি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি বদলানোর ওপর প্রতিমন্ত্রী যে গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটিও ইতিবাচক। তবে কোনো বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি প্রচারণায় নয়, কর্মদক্ষতায় গড়ে ওঠে। শিক্ষক সময়মতো শ্রেণিকক্ষে গেলে, শিক্ষার্থী নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছালে, পাঠদান নিয়মিত হলে এবং অভিভাবক বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা ফিরে পেলে সেই বিদ্যালয়ের পরিচয় আলাদা করে নির্মাণ করতে হয় না। একইভাবে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মান নিশ্চিত করতে খাদ্য পরীক্ষক, মাদার্স কমিটি ও কঠোর তদারকির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু যে শিশু বিদ্যালয়েই পৌঁছাতে পারছে না, তার কাছে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষানীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নটিই সবার আগে আসা উচিত।

এখন সময় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে সমন্বিত নীতিতে অগ্রসর হওয়ার। হাওরের জন্য প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ, আইনসমর্থিত এবং সময়সীমাবদ্ধ শিক্ষাপরিকল্পনা। সেখানে মৌসুমি শিক্ষা ক্যালেন্ডার, নিরাপদ নৌ-পরিবহন, প্রয়োজনভিত্তিক নৌকা বা ভাসমান বিদ্যালয়, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, শিক্ষক আবাসন, কর্মরত শিক্ষকদের জন্য হাওরভাতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, নৌপরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পানি সম্পদ- এই খাতগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হাওরের শিক্ষা সংকটের মূল উৎস শ্রেণিকক্ষের ভেতরে নয়; তার বাইরের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায়।

তাহিরপুর সফরে প্রতিমন্ত্রী যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন- হাওরের জন্য পৃথক পরিকল্পনা প্রয়োজন- সেটিই তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। এখন প্রয়োজন সেই উপলব্ধিকে দ্রুত নীতিতে রূপ দেওয়া। সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কঠোর জবাবদিহি ছাড়া এই ঘোষণাও অতীতের বহু অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির তালিকায় যুক্ত হবে।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারনে-  সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুটির শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। হাওরের শিশু কোনো অতিরিক্ত সুবিধা চায় না; সে চায় তার জন্মস্থান যেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে। একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মান বিচার হয় রাজধানীর আধুনিক বিদ্যালয়ে নয়, সবচেয়ে দুর্গম গ্রামের শিশুটির শিক্ষার সুযোগে। সেই পরীক্ষায় আমরা বহুদিন ধরে পিছিয়ে আছি। 

এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় নয়; সময় প্রতিশ্রুতিকে নীতিতে, নীতিকে বাস্তবায়নে এবং বাস্তবায়নকে শিশুর জীবনে পৌঁছে দেওয়ার। কারণ বহু বছরের শিক্ষাবঞ্চনার ক্ষত প্রতিশ্রুতির মলমে সারে না; সারে দূরদর্শী পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর জবাবদিহি এবং সময়মতো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]


শেয়ার করুনঃ