সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামের এক এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের দায়িত্ব আইন ও আদালতের। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পর যা ঘটেছে, তা শুধু একজন তরুণকে ঘিরে নয়; বরং একটি পুরো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ঘটনার পর অভিযুক্ত তরুণের বাড়িঘর ভাঙচুর, দোকানপাটে হামলা এবং একাধিক মন্দিরে আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় একটি সম্পূর্ণ সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো-অপরাধ ব্যক্তির, সম্প্রদায়ের নয়। কোনো নাগরিক আইন ভঙ্গ করলে তার বিচার আদালত করবে। কিন্তু একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের দায় যদি তার পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর এসে পড়ে, তবে তা শুধু অন্যায় নয়; আইনের শাসনের ধারণাকেও দুর্বল করে দেয়। গড়কাটির ঘটনায় সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে।

তাহিরপুর কোনো সাধারণ জনপদ নয়। এটি এমন একটি ভূখণ্ড, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে এসেছে। শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং অদ্বৈত মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সেই অঞ্চলে মন্দির ভাঙচুর, আতঙ্ক এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকৃত সত্য এখনো পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, স্ক্রিনশট কিংবা অভিযোগের উৎস ও সত্যতা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া এবং পরে তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে গুজব, বিকৃত তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কত দ্রুত সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে, তাহিরপুরের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এ কারণেই ঘটনাটিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজনএই উত্তেজনা কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি এর পেছনে কোনো সংগঠিত উসকানি, অসৎ উদ্দেশ্য বা পরিকল্পিত প্রচেষ্টা কাজ করেছে? কারণ বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বহুবার কিছু গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘটনার পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে আক্রান্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন এবং হামলা ও ভাঙচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে- দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করতে একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে; তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় হিন্দু-মুসলিমসহ সকল নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে। একটি দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই প্রত্যাশিত।

প্রকৃতপক্ষে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। যে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিদ্যমান, সেখানে সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার মাধ্যমে কারা লাভবান হতে পারে? কারা লাভবান হয় যখন প্রতিবেশী প্রতিবেশীর প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠে? কারা লাভবান হয় যখন উন্নয়ন, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান ও জনজীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে গিয়ে সমাজ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আলোচনায় বন্দী হয়ে যায়?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার নিশ্চিত করা নয়; বরং যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন অপরাধের ধরন নয়, অপরাধীর পরিচয় নয়; বরং আইনের মানদণ্ডই বিচার নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদী চরিত্রে। এই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ একক কোনো পরিচয়ের নয়; বরং বহু পরিচয়ের সম্মিলিত নির্মাণ। সেই বাস্তবতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গড়কাটির ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একজন তরুণের ফেসবুক পোস্টের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় প্রশ্ন- আমরা কি আইনকে বিচারক মানব, নাকি উত্তেজিত জনতাকে? আমরা কি সহাবস্থানের ঐতিহ্য রক্ষা করব, নাকি গুজব, ঘৃণা ও উসকানির কাছে তা বিসর্জন দেব?

তাহিরপুরের মানুষ অতীতে সম্প্রীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও তারা সেই পথেই থাকবে- এটাই প্রত্যাশা। আর সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, উসকানিদাতাদের চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে সমান আইনি ব্যবস্থা। তাহলেই তাহিরপুর আবারও প্রমাণ করতে পারবে- এই জনপদের প্রকৃত পরিচয় বিভাজন নয়, সম্প্রীতি।


  • লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। 


[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]


শেয়ার করুনঃ