নাজমুল হুদা
মে দিবস হোক ন্যায্যতার প্রতীক, আনুষ্ঠানিকতার নয়
রাসেল আহমদ
প্রকাশঃ ২৭ মে, ২০২৬ ৫:৪৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ প্রথম সারির একটি দেশ, যে জাতিসংঘের নেতৃত্বে শিশু অধিকার সনদে ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষর করেছে। আর এই সনদের ১৫ বছর আগেই ‘শিশু আইন ১৯৭৪’ প্রণয়ন করেছে- যেটি ২০১৩ সালে সংশোধন করে ‘শিশু আইন ২০১৩’ নামে কার্যকর করা হয়। এছাড়া এই রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে ‘জাতীয় শিশু নীতি ২০১১’ এবং বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে শিশু অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক থাকলেও শিশুর অধিকার ও সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মাঝখানে রয়েছে ভয়ংকর ফারাক।
যদিও রাষ্ট্র প্রায়ই বলে থাকে, প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? একদিকে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ভয়াবহতা, অন্যদিকে অপুষ্টি, শিশুশ্রম ও প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যুর মিছিল- সব মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন জাগে: এই দেশে শিশুরা আদৌ কতটা নিরাপদ?
সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আবারও শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও কয়েকটি শিশু হত্যা ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে নিখোঁজের একদিন পর চার বছরের শিশু লামিয়া আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে দশ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১৯ মে পাবনার চাটমোহরে টাকার প্রলোভনে ডেকে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
এই ধারাবাহিকতা নতুন নয়, তবে এর ঘনত্ব ও পুনরাবৃত্তি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পরই জনমনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, প্রতিবাদ হয়, দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। কিন্তু বিচার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শিশু রামিসার ঘাতক সোহেল ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা এবং তার নিথর দেহ থেকে মাথা ধারালো চাকু দিয়ে আলাদা করাসহ ছোট্ট শিশুটির শরীরের ওপর স্বামী-স্ত্রীর নৃশংসতার লোমহর্ষক কাহিনি তুলে ধরেছে।
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সারাদেশ। গণমাধ্যমে এটি প্রধান খবর হয়ে ওঠে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজধানীসহ সারাদেশে এ ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মিছিল-মিটিং, মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। প্রটোকল ভেঙে শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে রামিসার বাসায় ছুটে যান দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এক মাসের মধ্যে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হবে।
রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন নিশাতের বাবা আবু সাদিক মিয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, “দেড় মাস হলো বাচ্চাটা মারা গেছে, আমার ঘুম আসে না। ফেসবুকে যখন রামিসার ঘটনা দেখলাম, তখন ভাবলাম বাচ্চাটার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। আমার মেয়েটাকে শ্বাসরোধ করে, হাত-পা ভেঙে, নির্যাতন করে মারা হয়েছে। মামলা করার পরও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজ প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল, এখনো চার্জশিট দেয়নি।”
শুধু দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। ভিন্ন এক জেলা থেকে এক হতভাগ্য শিশুর বাবা ছুটে এসেছেন ঢাকায়, আরেক নিহত শিশুর বাবার পাশে দাঁড়াতে। কারণ তিনি জানেন, সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার যন্ত্রণা কেমন। বিচার না পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা কতটা অসহায় করে দেয় একজন মানুষকে।
আসুন আমরা একটু পেছনে ফিরে যাই। এক বছর তিন মাস আগে আট বছরের আছিয়া বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছিল। তাকে অচেতন অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়। আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সিএমএইচে মারা যায় শিশুটি। পুরো দেশ কেঁদেছিল তখন। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দ্রুত বিচার হবে। বিচারিক আদালতে প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ডও হয়েছিল। কিন্তু আজও সেই রায় কার্যকর হয়নি।
২৪ মে শনিবার দুপুরের ঘটনা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের তেলিকান্দা উত্তর পাড়া গ্রামের সৌদি প্রবাসী পিতার ৯ বছরের কন্যাশিশুটি বাড়ির পাশে খেলা করছিল। প্রতিবেশী সহিদ মিয়া তাকে চিপস কিনে দেওয়ার কথা বলে দূরবর্তী নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় ঘটনাটি কাউকে জানালে শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরে সহিদ নিজেই ওই শিশুকে নদীতে গোসল করিয়ে বাড়ির সামনে রেখে যায়। একপর্যায়ে শিশুটি অসুস্থতা বোধ করলে সে পরিবারকে বিষয়টি জানায়। পরে পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
পুলিশ বলেছে, লিখিত অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত শিশুটির শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, ধর্ষণের পর শিশুটিকে নদীতে গোসলের নামে ধোয়ামোছা করার পর ধর্ষণের আলামত কি থাকে? এর উত্তর যদি হয়- না, তাহলে কিসের ভিত্তিতে ধর্ষককে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে রাষ্ট্র? কেনই বা পুলিশ এখনো লিখিত অভিযোগের আশায় বসে থাকে? রাষ্ট্র কি শিশুর নিরাপত্তা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ নয়?
আরও প্রশ্ন হচ্ছে, রামিসাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এক মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার ঘোষণা কি শুধু রামিসার জন্য? গত ২০ মাসে যে আরও ৬৪২ শিশু নির্যাতনের পর হত্যা হয়েছে, তাদের বিচার কে করবে? কবে করবে? আদৌ কি করবে?
রামিসার ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, তাই ক্ষুব্ধ জনগণকে নিবৃত্ত করতেই সরকারপ্রধানের এ প্রয়াস। হয়তো তিনি তার কথা রাখবেন।
এবার নেত্রকোনার মদন উপজেলার সেই কওমি মাদ্রাসার ঘটনাটি মনে করুন। ১১ বছরের এক কন্যাশিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠছিল। পরে চিকিৎসকেরা জানান, সে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। একটি শিশুর শরীরে বড় হচ্ছিল আরেকটি শিশু। অভিযোগ ছিল মাদ্রাসার শিক্ষক আমানউল্লাহ সাগরের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। অভিযুক্ত শিক্ষক আত্মগোপনে চলে যায়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু মাত্র এক মাস যেতে না যেতেই সেই শিশুটি আর প্রাসঙ্গিক থাকেনি।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মাদ্রাসাগুলোতে শুধু মেয়েশিশু নয়, অসংখ্য ছেলে শিশুও প্রতিনিয়ত বলাৎকার ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমনকি এসব ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভিকটিমকে উঁচু ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। আবাসিক মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক ঘটনায় শিশুরা বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেও মুখ খুলতে পারে না। পরিবারগুলো সামাজিক লজ্জার ভয়ে চুপ থাকে। বেশিরভাগ মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক প্রভাবশালী, ধর্মীয় নেতা বা রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুনাম বাঁচাতে এসব ঘটনা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার কার্যকর কোনো নজরদারি আছে কি? ছেলে শিশুদের বলাৎকারের ঘটনাগুলো কেন অধিকাংশ সময় আড়ালেই থেকে যায়? শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা ছিল যে জায়গাগুলোতে, সেগুলোই কেন তাদের জন্য ভয় ও আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হচ্ছে?
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র বাংলাদেশে
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ শিশু নিয়মিত সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু ঘরে, স্কুলে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়। মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয় নিজের ঘরেই। পরিবার, যা শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, অনেক সময় সেটিই হয়ে উঠছে ভয় ও নীরবতার জায়গা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত চার মাসে দেশে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত ২০ মাসে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৬৪২ শিশু। মানবাধিকার সংগঠন ‘এইচআরএসএস’ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৫৮০ শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সংখ্যাগুলো পড়তে খুব ছোট মনে হয়। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি শিশুর থেমে যাওয়া শৈশব, একটি পরিবারের ভেঙে পড়া জীবন।
এই পরিস্থিতি প্রশ্ন রাখে, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ কিংবা ‘জাতীয় শিশু নীতি ২০১১’- এগুলো কি কেবলই কাগুজে নথি? নাকি রাষ্ট্র এসবের ধার ধারছে না?
প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট, শিশু ধর্ষণ, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঠেকাতে বা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা রয়েছে কি?
মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফওজিয়া করিম গণমাধ্যমে বলেন, "যৌন হয়রানি বা এ-সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি নীতিমালা আছে, কিন্তু সেটি আইনে পরিণত হয়নি।"
অর্থাৎ বাংলাদেশে এখনও যৌন হয়রানি ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ পৃথক আইন নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় নীতিমালা আছে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। কয়েকদিন আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত থাকে, তারপর আরেকটি নতুন ঘটনা আগের ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। আমাদের শিশুরা থেকে যায় একই অনিরাপত্তায়।
তবে অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে শিশু ধর্ষণ, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের মতো এসব অপরাধ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর আওতায়ই প্রতিটি ঘটনার বিচার করা সম্ভব।
এখানেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, এই আইনে বিচারের এত দীর্ঘসূত্রতা কেন? তদন্তে বছরের পর বছর লাগে কেন? চার্জশিট দিতে দেরি হয় কেন? উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাগুলো ঝুলে থাকে কেন? শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? রাষ্ট্র কি সত্যিই এসব মামলার নিষ্পত্তি চায়, নাকি প্রতিটি ঘটনায় কিছুদিন আবেগ দেখিয়ে পরে সব আগের মতো হয়ে যায়?
শুধু ধর্ষণ-নির্যাতন নয়, শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্নেও বাংলাদেশ এখন গভীর সংকটে। ২০২৬ সালে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান। এই তথ্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনকও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে দেশি-বিদেশি
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসূত্র বলছে, গত ৭২ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়। আর পরবর্তী ৭২ দিনে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬৬ হাজার ২৩ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫২ হাজার ৫৩০ জন।
তবে হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায়ও তথ্য নিয়ে চলছে লুকোচুরি খেলা। নিউ এইজ পত্রিকার শীর্ষ খবর- "Measles toll far higher than official count"; অর্থাৎ বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসমালোচনা এড়াতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এটি ইচ্ছাকৃত গোপন নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এমন পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণকারীদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই মৃত্যুকে নিছক দুর্ভাগ্য বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকেই তারা সরকারকে টিকা সংকট নিয়ে বারবার সতর্ক করেছিল। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে লাখ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, "কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না।" এই একটি বাক্যই পুরো পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে। অর্থাৎ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস ছিল। সতর্কবার্তাও ছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগত জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে-এমন ইঙ্গিত ইউনিসেফের বক্তব্যেই স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে অর্ধসহস্রাধিক শিশুর মৃত্যু হলো, তার দায় কে নেবে? সরকার কি এই ঘটনায় কোনো স্বাধীন তদন্ত করবে? সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে? নাকি এতগুলো শিশুর মৃত্যুও শেষ পর্যন্ত কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে?
প্রতিটি সভ্য জাতি ও রাষ্ট্র শিশুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে থাকে। বাংলাদেশে কেন শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা টিকার অভাবে শিশুমৃত্যু ঘটছে? কেন এ দেশে অপুষ্টি, শিশুশ্রম ও পথশিশুর অনিরাপদ জীবন এখনো বাস্তবতা? জানতে ইচ্ছা করে, আমাদের শিশুরা আসলে কোন ধরনের রাষ্ট্রে বড় হচ্ছে? শিশু সুরক্ষায় ব্যর্থ এই রাষ্ট্রকে আমরা কী নামে অভিহিত করব?
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ (UNICEF)। সংস্থাটি বলেছে, মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুরা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। যেসব জায়গায় তাদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা ছিল, সেখানেই এসব সহিংসতার শিকার হয়েছে তারা। ইউনিসেফ আরও বলেছে, অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মস্থল, পাড়া-মহল্লা ও যত্নসেবা কেন্দ্রগুলোতে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
তবে যে দেশে এক শিশুর বাবা আরেক নিহত শিশুর বাবাকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে আসেন, কারণ দুজনই জানেন তাদের সন্তানের বিচার অনিশ্চিত- সেই রাষ্ট্রের শাসকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই: শিশুদের রক্ষা করার নৈতিক ও সাংবিধানিক সক্ষমতা কি রাষ্ট্র হারিয়ে ফেলছে?
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তার দৃষ্টিনন্দন রাস্তাঘাট, সেতু, নদীর বুকে ব্যারেজ নির্মাণ জাতীয় মেগাপ্রকল্প, প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অত্যাধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারছে- সেখানেই। যে দেশে শিশুরা টিকার অভাবে প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধিতে মারা যায়, ধর্ষণের শিকার হয়, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে, যে দেশে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে, শ্রমে নিযুক্ত হয় এবং রাস্তায় বড় হয়, সেই রাষ্ট্র আর যাই হোক উন্নয়নের পূর্ণ দাবিদার হতে পারে না।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।