২৬ আগস্ট ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / দুর্যোগ

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ৫৫ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৫২ অপরাহ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে এই বন্যায় রাস্তাঘাট, সেতু ও বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।



স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বন্যার পর এখন পর্যন্ত ৫৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।


নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যার পর ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় ও ১২ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন।


কর্মকর্তারা জানান, বুধবার সকাল ৯টার দিকে নদীর দুই কূল উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।


পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, প্রাথমিক মূল্যায়নে একটি বরফধসের কারণে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে যায়। এর জেরেই ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ভোতেকোশি লেন্দে নদীর একটি উপনদী।


চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, নেপাল সীমান্তে মূলত ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এটি জিরং বন্দরে আঘাত হানে। এতে নেপাল সীমান্তবর্তী শিগাতসে অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।


নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, ‘উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য আমরা ভারত ও চীন উভয় দেশকেই অনুরোধ জানিয়েছি।’


দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আটজন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন। আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় কর্মী সেখানে আটকা পড়েছেন। তাঁদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার পাঠানো হবে।


নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রায় অংশ নেওয়া তীর্থযাত্রী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁরা তিব্বতের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।


কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘টাচ কৈলাস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বসু কুমার অধিকারী জানান, ৯৩ জন নেপালিসহ মোট ৩৯০ জন তীর্থযাত্রীর ওই সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বেলা তিনটা পর্যন্ত আমরা মাত্র কয়েকজনের খোঁজ পেয়েছি। বাকি কোনো তীর্থযাত্রীর সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারিনি।’


নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান ও ৩ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তবে নিখোঁজ আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের একটি স্থলবন্দরে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে জিরং কাউন্টিতে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন। সেখানে ‘ব্যাপক প্রাণহানির’ আশঙ্কা করছেন তারা।


কর্মকর্তারা জানান, নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে জেলার দুর্গত স্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো অবতরণ করতে পারেনি।


কান্তিপুর পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যাকবলিত রসুয়ায় ত্রাণ নিয়ে তিনটি হেলিকপ্টার রওনা হয়েছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেগুলো কাঠমান্ডুতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এতে উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে বন্যার পানিতে ভেঙে পড়া বাড়িঘর ও ভাসমান গাড়ি দেখা গেছে। পানির তোড়ে একটি লোহার সেতুও ভেসে যেতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানান, বন্যার পানিতে আস্ত গ্রাম তলিয়ে গেছে।


রসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার বলেন, ‘বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।’ গ্রামের পর গ্রাম এবং বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর তিনি ভোতেকোশি নদীর তীরের বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।


রসুয়া জেলার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বি কে রয়টার্সকে বলেন, ‘যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু ধ্বংসযজ্ঞ চোখে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নদীর পাশের জনবসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পরিবারেরই পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন।’


নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বস্নেত জানান, পানি না কমা পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারবে না।


আকস্মিক এই বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গত বছরও একই নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। পরে জানা যায়, একটি হিমবাহের হ্রদ থেকে ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।


এদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ তল্লাশি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে বন্যা–পরবর্তী অন্য কোনো দুর্যোগ এড়াতে নজরদারি ব্যবস্থা ও আগাম সতর্কসংকেত আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

নেপাল, বন্যা, পর্যটক, হিমালয়, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ভূমিকম্প

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ