শাহজালাল মাজার: কর্তন করা খেজুর গাছ জব্দ ও নির্মাণ কাজ স্থগিত
অনুসন্ধান
ভুমি অধিগ্রহণে জটিলতা, ৭টি মামলা ও একটি মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে আছে নির্মাণ কাজ। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ।
প্রকাশঃ ২১ এপ্রিল ২০২৫
আড়াই বছরের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও ১০ মাস পার হলেও নানা জটিলতায় আটকে আছে কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট চারলেন সড়ক নির্মাণ কাজ। নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ৪৫-৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হতে আরও ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
তবে, প্রকল্পের আওতাধীন দেড় কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সাড়ে ৭ কিলোমিটার এলাকায় অধিগ্রহণকৃত জমির টাকা পরিশোধ না করা, ভূমি মালিকদের ৭টি মামলা, একটি মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশসহ এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী ৬ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ অবস্থায় নগরবাসীর দুর্ভোগ লাগবের জন্য নির্মাণাধীন এই সড়কের সুবিধা পেতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে সিলেটবাসীকে। এ নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি এই সড়ক নির্মাণ কাজে বিলম্ব হওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
সিলেট নগরীর মধ্য দিয়ে কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়কে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার পাথর বোঝাই ভারি ট্রাক যাতায়াত করে। এতে প্রায় সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে ও নগরীর ভেতর দিয়ে ট্রাক চলাচলের চাপ কমাতে কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়কটি নির্মাণ করা হয় ২০১২-১৪ অর্থবছরে। পরবর্তীতে সড়কটি চারলেনে উন্নীত করার দাবি তোলেন সিলেটবাসী। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। পরের বছর চার লেন সড়কের সঙ্গে দুটি সার্ভিস লেন যুক্ত করে তৈরি করা হয় সংশোধিত প্রস্তাবনা। ২০১৯ সালের দিকে শুধু চারলেনের প্রস্তাবনা জমা পড়ে মন্ত্রণালয়ে। অবশেষে জটিলতা কাটিয়ে ২০২২ সালে জানুয়ারি মাসে কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট চারলেন সড়কের উদ্বোধন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।
সিলেট সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৭২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট চারলেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। যার নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।
সেসময় প্রকাশিত দরপত্র অনুযায়ী সওজ জানিয়েছিল, এ প্রকল্পের আওতায় মাটির কাজসহ ১১.৮৭১ কিলোমিটার (চারলেন) সড়ক হবে রিজিড পেভমেন্টের। আর ০.৭০০ কিলোমিটার হবে ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টের। এছাড়া সড়কে দুটি পিসি গার্ডার সেতু, ২৪টি ছোট আরসিসি কালভার্ট, দুটি লিংক রোড, ছয়টি বাস-বে, আরসিসি ড্রেনসহ ফুটপাত, সিগন্যাল স্থাপন ও সড়ক রক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
এছাড়াও সওজ’র তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ হবে ৩১.৮২ একর। এতে ব্যয় হবে ২৪২ কোটি ১২ লাখ টাকা। ১ দশমিক ২ মিটার ডিভাইডার এবং দুই পাশে ৭ দশমিক ৯ মিটার করে ১৫ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত হবে চারলেন বিশিষ্ট এ সড়ক। সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সড়কটিতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের জুনে। মেয়াদোত্তীর্ণের ১০ মাস পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে ইতোমধ্যে ৪৫-৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া সর্বমোট ১৭টি কালভার্ট ও ২টি সংযোগ সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ৫টি কালভার্ট নিমার্ণ কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট ইতোমধ্যে ৭৮ কোটি টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে মামলা ও আইনীঅ জটিলতার কারণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভূমি মালিকদের কোনো টাকা পরিশোধ করেনি।
সূত্র জানায়, জমি অধিগ্রহণ, ৭টি মামলা ও একটি মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার কারণে চারলেনের এই সড়কে কাজের অগ্রগতি শুরু থেকেই কম ছিল। যার কারণে মেয়াদ শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়কে প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তা ১৮ ফুট প্রশস্ত হিসেবে রেকর্ড ছিলো। কিন্তু ২০২৩ সালে বিএস জরিপে সেই সড়ক ৬৪ ফুট হিসেবে রেকর্ড দেখানো হয়েছে। এই ৭ কিলোমিটারের মধ্যে ধুপনিখলা মৌজার দেড় কিলোমিটার রাস্তা এলাকাবাসী ১৮ ফুট হিসেবে রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, বাকি ৪৬ ফুটের মালিকানা জনগণের। অবশ্য ৭ কিলোমিটারের মধ্যে বাকি সাড়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে নি।
জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, সড়ক নির্মাণে একটি পেট্রোল পাম্প ও একটি হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষযে বিষয়ে আদালতে ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটি মামলায় আদালত সড়কের কাজের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুমারগাঁও থেকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার সম্মুখ পর্যন্ত রাস্তার নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশ দিয়ে ড্রেনেজ নির্মাণও সম্পন্ন হয়েছে এ অংশে। তবে নির্মাণাধীন জায়গায় নয়াবাজার-বাদাঘাট রোড মসজিদ ও সোনাতলা বাজারে একটি পারিবারিক কবরস্থান রয়েছে। এসব জায়গায় স্থানীয়দের বাঁধায় কাজ বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া বাদাঘাট-এয়ারপোর্ট সড়কস্থ ধুপনিখলা মৌজায় প্রায় ১.৫ কিলোমিটার রাস্তায় কোন ধরণের কাজ দৃশ্যমান হয়নি। চামাউড়া-সালুটিকর মৌজায় রাস্তার উপর মাটি ফেলা হয়েছে। তবে সড়ক নির্মার্ণে কোন কাজ দৃশ্যমান হয়নি। অবশ্য সড়কজুড়ে কালভার্ট ও সংযোগ সেতু নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।
এ ব্যাপারে জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়্যারম্যান মানিক মিয়া বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কোনো টাকা এখনও কোনো জমির মালিক টাকা পায়নি। আর জমি সংক্রান্ত কিছু জটিলতা চলছে। সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সড়কের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্টা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, কাজ করতে গিয়ে আমরা বারবার প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ নিয়ে সড়ক বিভাগে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কোনো অগ্রগতি পাচ্ছি না। ফলে কাজে ধীরগতি চলে এসেছে।
তিনি বলেন, এখনও সড়কের অর্ধেক অংশের জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। যার কারণে এই অংশে দৃশ্যত কোনো কাজ হয়নি।
জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং সিলেটের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসকের নিকট ইতোমধ্যে ৭৮ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। ধুপনিখলা মৌজা ১.৫ কিলোমিটারের জায়গা নিয়ে স্থানীয়রা কাজে বাঁধা দেওয়ায় জমি অধিগ্রহণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কুমারগাঁও পয়েন্টে একটি তেল পাম্প ও এয়ারপোর্টস্থ হোটেল ফিনল্যান্ডসহ স্থানীয়রা মোট ৭টি মামলা দায়ের করেছে। একটি মামলায় আদালত থেকে কাজের স্টে-অর্ডারও এসেছে। এসকল মামলা চলমান থাকায় আমরা কাজে অগ্রগতি আনতে পারছি না। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও কাজ চলছে।
নির্ধারিত বাজেটেই এ প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হবে কিনা জাননে চাইলে আমির হোসেন বলেন, আমরা আসলে কাজ করতেই পারছি না নানা জটিলতায়। কাজ করতে পারলে বলা যেত আমরা নির্ধারিত বাজেটেই কাজ শেষ করতো পারবো কিনা। তবে নির্ধারিত বাজেটেই কাজ শেষ করতে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আমির হোসেন বলেন, জাতীয় অর্থনীতির জন্য কুমারগাঁও-বাদাঘাট-এয়ারপোর্টের ৪ লেনের মহাসড়ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সিলেট শহরের অভ্যন্তরে যানজট নিরসনের জন্য এ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কেননা সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পণ্য ও পাথরের গাড়ি আটক থাকে, এতে খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ছে। জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য জটিলতা কাজে ধীরগতি চলে এসেছে। এছাড়া নির্মাণাধীন এসব জায়গা হাওর বেষ্টিতও ও বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হওয়াই কাজে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। এসব জটিলতা শেষে পরবর্তী ৬মাসের ভিতরে এ প্রকল্প শেষ করা সম্ভব’ বলে জানান সওজের এই কর্মকর্তা।
জমি অধিগ্রহণের টাকা হস্তান্তর না করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসাইন মো. আল-জুনায়েদ বলেন, আমার এ ব্যাপারে জানা নেই। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে সিলেটের সড়ক ও জনপথ বিভাগে যোগাযোগের করার কথা বলেন তিনি।
কুমারগাঁও বাদাঘাট এয়ারপোর্ট সড়ক, সিলেট চারলেন সড়ক প্রকল্প, সড়ক নির্মাণে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, সিলেট সওজ, বাদাঘাট সড়ক মামলা, সড়ক উন্নয়ন সিলেট, চারলেন প্রকল্প স্থগিত, সড়ক নির্মাণ সমস্যা, আর্থিক বরাদ্দ ও মামলা