শাল্লায় কৃষি কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ১৪ জুন, ২০২৬ ৮:০৫ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা ও উজানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা মানবিক সহায়তা কৃষি কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম,দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১ম ধাপে ২০ হাজার ২৫০ জন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চূড়ান্ত তালিকায় ১০ হাজার ১৫০ জন কৃষকদের নাম স্থান পায়। চূড়ান্ত তালিকায়ও অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যেন শেষ নেই।
প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক কিছু তালিকা প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদের দেয়ালে টাঙানো হলে পুরো উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছে ব্যবসায়ী, অকৃষক, উদ্যােক্তা,চাকরিজীবি সহ তাদের পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করেন তাদেরকে একদিনের জন্য এলাকায় এনে তাদের হাতে মানবিক সহায়তা কৃষি কার্ডের তিন হাজার টাকা ও পনেরো কেজি চাউল তুলে দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন তালিকা বঞ্চিত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকেরা। গত ৮ জুন সকাল এগারোটায় বিক্ষোভটি ইউএনও অফিস থেকে পরে ২নং হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও করে।
উপজেলার ভরাম হাওরের কৃষক আগুয়াই গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্ত চন্দ্র দাস বলেন, তেরো কিয়ার (২৮ শতকে ১ কিয়ার) জমি করেছিলাম। কোনমতে তিন কিয়ার জমিনের ধান কাটলেও রোদের অভাবে সে ধানগুলোও পঁচে যায়। মেম্বার প্রথমে আমার নাম তালিকায় দিছিল। ভাবছিলাম সরকারের সহায়তা পেলে কিছুটা হলেও পরিবারে স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হঠাৎ শুনি আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এখন মেম্বারকে ফোন দিলেও ফোন ধরে না।
তিনি বলেন, তিল পরিমাণ জমি নেই, কোনদিন জমি করেননি এমন লোকের নাম সরকারের সাহায্যের তালিকায় দেওয়া হয়েছে। আক্ষেপ করে এই কৃষক বলেন এখন পরিবারের সদস্যের নিয়ে কিভাবে যে দিন কাটাবো? এই চিন্তায় আছি।
ছায়ার হাওরের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক মন্নানপুর গ্রামের বাসিন্দা ইন্নছ মিয়া বলেন, যাত ক্ষেতকিরি (জমি) করছে না তালিকায় তাদের নামও আছে। আমরা এতো ক্ষতিগ্রস্থ অইছি (হয়েছি) পঁচা ধান টানছি অথচ সরকারের তালিকায় আমাদের নাম নাই।
তিনি বলেন, আমি ২০-২৫ কের ক্ষেত করছিলাম সবই পানির তলে গেছেগা। অনেক কষ্ট করে কিছু পঁচা ধান তুলেছি। আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েও যদি সরকারের সহযোগিতা না পাই তাহলে এখন কি করি?
অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের চূড়ান্ত তালিকায় উপজেলার ১নং আটগাঁও ইউনিয়নে প্রকৃত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতি করে মহিলা ইউপি সদস্য নুরজাহান আক্তারের স্বামী ফজলু মিয়া, শশুর জলিল মিয়া ও দেবর বাচ্চু মিয়ার নাম তালিকায় অর্ন্তভুক্তি করা হয়েছে।
একই ইউনিয়নের আরেক মহিলা সদস্য সুজিয়া বেগমের দুই ছেলে হাকিমুল মিয়া ও আলি আহমদের নাম রয়েছে এই তালিকায়।
একই চিত্র ২নং হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদেও। একই পরিবারের অকৃষক সাত ভাইয়ের নাম রয়েছে তালিকায়। তারা সাতজনই ওই ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের কালাই মিয়ার ছেলে। শুধু তাই নয়, কৃষক নন এমন ভূয়া ব্যক্তির নাম থাকার তথ্যও মিলেছে এই ইউনিয়নে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে তাদেরকে বিল দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ২নং হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু ও সচিব সমীর চন্দ্র সরকারের যোগসাজশে একটি চক্র তালিকায় অনিয়মের সাথে জড়িত রয়েছে।
বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যােক্তা বিষ্ণু দাশ, তার আপন ভাই ওমান প্রবাসী হরিপদ দাসের স্ত্রী শিল্পী রানী দাস, বিষ্ণু চন্দ্র দাসের বাবা অকৃষক রবীন্দ্র দাশের নাম ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকায় অর্ন্তভুক্তি করেছেন ওই চক্রটি।
শুধু তাই নয়, অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দিনকেও এই ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকায় তোলা হয়েছে।
আবার গত ২৬ মে প্রবাসী হরিপদ দাশের স্ত্রী অকৃষক শিল্পী রানী দাশ, মাছ ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দিন এদেরকে দিয়েই কৃষি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনও করা হয়েছে। এতে তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এবং এই চক্রটি অকৃষক,ব্যবসায়ী সহ নানা পেশার অন্তত অর্ধশতাধিক লোকের নাম ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকায় অর্ন্তভুক্তি করেছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানান সিন্ডিকেট চক্রদের এমন দুর্নীতির কারনে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ প্রকৃত কৃষকেরা সরকারের মানবিক এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে ৩নং বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে সরাসরি কথা হয় সচিব সমীর চন্দ্র সরকারের সাথে। তিনি বলেন, এনিয়ে আমার বিরুদ্ধে অনেক নিউজ হয়েছে, আর কোন নিউজ করার দরকার নেই। এ বিষয়ে আমি কোনকিছু বলতে পারবো না।
এ ব্যাপারে চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে অফিসে বসা রেখেই অফিস থেকে বের হয়ে যান।
পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে অফিসে গিয়ে ৩নং বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টুকে তার অফিসে উপস্থিত পাওয়া যায়নি। গত দু'দিন যাবত একাধিকবার ফোন দিলেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, বাহাড়া ইউনিয়নের বিষয়গুলো ইতোমধ্যে সমাধান করার জন্য সচিবকে বলে দেওয়া হয়েছে। হবিবপুর ইউনিয়নে একই পরিবারের সাত ছেলের নাম অর্ন্তভুক্তি সহ অন্যান্য বিষয়গুলো চেয়ারম্যান সাহেব বসে সমাধান করবে।
তিনি বলেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারপরও সুনির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্য সহকারে কেউ অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকাটি জেলা থেকে দেখাশোনা করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: মতিউর রহমান খান। এবিষয়ে তিনি বলেন, কোথাও স্পেসিফিক অনিয়মের কোন তথ্য থাকলে সেবিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বলে দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের জায়গাগুলো সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
কৃষি কার্ড, প্রণোদনা, কৃষক, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, শাল্লা