১৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি / রাজনৈতিক দল

সিলেটে ডা. শফিকুর রহমান

‘সংবিধানে আইনি সংস্কার না হলে রাজপথে আন্দোলন’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৪ জুন, ২০২৬ ৯:৫৩ অপরাহ্ন


জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত নির্বাচনে দেশের ৬৮.৬ ভাগ মানুষ ভোট দিয়ে তাদের রায় স্পষ্ট করেছে। এই রায়কে যদি ব্যর্থ করে দেওয়া হয়, তবে দেশে কোনোদিনই টেকসই সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। আর সংসদ যদি সংকুচিত হয়ে পড়ে, তবে রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। সংবিধানে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার না হলে এবং জনগণের এই রায় বাস্তবায়িত না হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তা আদায় করা হবে।


আজ রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউজে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেন।


বিগত নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে জামায়াতের আমীর বলেন, হিসাব-নিকাশ স্পষ্ট। আমাদের অবস্থান ছিল গণভোটের পক্ষে। ৬৮.৬ ভাগ মানুষ ভোট দিয়েছে এবং এটা পরিষ্কার এই মানুষগুলো কোথায় ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে গাছে, মাছে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে সর্বত্র আওয়াজ একটাই ছিল। ফলে এত মানুষের মুখ বন্ধ করে এই নির্বাচনের পরে সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে গিয়েছি, তারা বলেছে—ভোট দিলাম আপনাদের, সরকার গঠন করল আরেক দল, এটা কেমনে? এবং আপনারা এটা মেনে নিলেন কেন? মানুষের একটু ক্ষোভ আমাদের ওপরে ছিল।


তিনি আরও বলেন, আমরা সংসদে গিয়ে বিবেকের কাছে, জনগণের কাছে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে দুইটা শপথ নিয়েছি। আমরা মানুষকে কথা দিয়েছিলাম—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, আমরা দেশবাসীকে ফেলে কোথাও যাব না। প্রথম সংসদেই আমরা আমাদের অভিপ্রায় জানিয়ে দিয়েছি যে, ভালো কাজের সকল কাজে আমরা সহযোগিতা করব। কিন্তু অন্য কোনো কাজে সহযোগিতা তো করবই না, বরঞ্চ প্রতিবাদ করব।


সরকারের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দল জনগণকে দেওয়া ওয়াদা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছে। তারাই বলেছিল নির্বাচনের আগে, গণভোটের রায় যেদিকে যাবে সেটা আমরা সবাই মানব। এখন তারা প্রশ্ন করছেন গণভোটের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নাই। স্বাধীনতার পরে আরও তিনটা গণভোট হয়েছে, সেগুলো কি সাংবিধানিক ছিল? তখন যদি গণভোট হালাল হয়ে থাকে, এখন হারাম হয় কীভাবে? একই অর্ডারে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং নির্বাচন সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচন হালাল হলে, গণভোট হারাম হয় কীভাবে? একই হাড়িতে পাকানো তরকারির গোশত যদি হালাল হয়, শোরবা কি হারাম হতে পারে?


সীমান্ত উত্তেজনা ও সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা দেখছেন সীমান্তে অব্যাহত উত্তেজনা চলতেছে। সীমান্তের ওপার থেকে এমন সব উসকানিমূলক কথাবার্তা বলা হচ্ছে। আমরা যদি দেশ এবং জাতি হিসেবে প্রত্যেকটা কথার জবাব দিতে যাই, প্রতিদিন একবার যুদ্ধ বাধবে। এটা কোন উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, তা বুঝতে এ দেশের মানুষের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।


তিনি বলেন, পরশুদিন পাশের দেশ থেকে একজন রাষ্ট্রদূত এসে বললেন—দুই দেশ এক হয়ে যাক, ১৪০ আর ২০ কোটি মিলালে ১৬০ কোটি হয়ে যায়। আমি এটার ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছি। আমার ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজারকে দূতাবাস থেকে লেখা হয়েছে যে, তিনি কেন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। কম খাব, কম পাব, অসুবিধা নাই; কিন্তু আমার দেশের জমি অন্য কাউকে লিখে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।


সংসদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের ভেতরে স্পিকারকে চেয়ার দিয়ে আঘাত করা হয়, ফাইল ছোড়া হয়, গালিগালাজ করা হয়, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন করা হয়। আমরা সংসদের ভেতরে চরমপন্থা অবলম্বন করব না, আমাদের অবস্থান মধ্যম ও যৌক্তিক। কিন্তু গতকালকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এক জায়গায় গিয়ে আমাদেরকে একটা অপবাদ দিয়ে বললেন, আমরা নাকি কোথায় মিছিল করেছি তামাক ও মদের ট্যাক্স বাড়ানোর বিরুদ্ধে।


তিনি বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখলাম, এআই দিয়ে আমাদের নামে এবং সমকালের নামে একটা ভুয়া ফটো বানানো হয়েছে। উনি প্রধানমন্ত্রী, উনার তথ্য যাচাই করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। মিথ্যা এআই দিয়ে বানানো একটা জিনিস উনি বিপণন করছেন।


বাজেট ও কর প্রসঙ্গে জামায়াতের আমীর বলেন, বাজেটে ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ট্যাক্স বসানো হয়েছিল। মোটরসাইকেল চালকদের ওপর বার্ষিক ট্যাক্স বসানো হয়েছে, আমরা সাথে সাথে এটার বিরোধিতা করছি। মোটরসাইকেল কি মানুষ শখে চালায়? পেটের আগুন নিভানোর জন্য, ক্ষুধার আগুন নিভানোর জন্য মানুষ বাইক চালায়। আপনি তার ওপর ট্যাক্স বসান! ট্যাক্স বসান তাদের ওপর, যাদের দেওয়ার সামর্থ্য আছে। আমাদের দেশে ১ কোটি মানুষ ট্যাক্স দেওয়ার মতো আছে, অথচ ট্যাক্স দেয় মাত্র ৩৪ লাখ লোক।


বাজেটে সুশাসনের অভাব নিয়ে তিনি বলেন, এই বাজেটে দুইটা ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নাই—এ দেশের দুর্নীতি বন্ধ হবে কিনা এবং জনগণ সুশাসন পাবে কিনা। যদি দুর্নীতি বন্ধ না হয় আর ন্যায়বিচার সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে এই বাজেট কোনো কাজে লাগবে না। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য স্বাধীন জুডিশিয়াল সেক্রেটারিয়েট হবে, অথচ সরকার তা নাকজ করে দিল। আমরা সংবিধানে এমন আইন চাচ্ছি, যাতে নির্বাচিত শাসকরা আর ফ্যাসিস্ট হতে না পারে। আমরা বাংলাদেশে আর ফ্যাসিজম চাই না।


ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি গতকালও বলেছি, হাতে খুব বেশি সময় নাই। তাড়াতাড়ি গোছান, সংশোধন হন, পরিবর্তন হন। এই জাতি পরিবর্তন চায়, যুবসমাজ পরিবর্তন চায়। যুবসমাজ আর পচা-ধোনা রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা শক্তির পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তন জনকল্যাণে, দেশের স্বার্থে ও জাতির স্বার্থে।


শেয়ার করুনঃ

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন

সংবিধান, আইনি সংস্কার, আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, শফিকুর রহমান, গণভোট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ