১৮ মে ২০২৬

বিশ্বজুড়ে

‘প্রথম দুর্যোগে ঘর হারিয়েছিলাম, এবার হারালাম পুরো ইতিহাস’

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ১৮ মে, ২০২৬ ২:০০ অপরাহ্ন

ছবিঃ ফাতেমা ওবাইদ ও ১৯৪৮ সালের দুর্যোগের আগে বাবার দেওয়া কানের দুল

প্রতিদিনের বোমাবর্ষণ, অনাহার, বাস্তুচ্যুতি আর পরিবারের ৭০ জন সদস্য হারানোর অসহনীয় বেদনা নিয়েও গাজা শহর ছাড়েননি ৯৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী ফাতেমা ওবাইদ। ১৯৪৮ সালের দুর্যোগ থেকে বেঁচে ফেরা এই বৃদ্ধার কাছে আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়া মানে ছিল আরেকটি আরও নিষ্ঠুর দুর্যোগের শুরু।

গাজার পশ্চিমাঞ্চলের একটি অসম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে আশ্রয় নেওয়া ফাতেমা ওবাইদ বলেন, প্রথম নাকবায় (দুর্যোগ) মানুষ জমি, বাড়ি আর গ্রাম হারিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা হারিয়েছি পুরো একটি ইতিহাস।

গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকার বাসিন্দা ওবাইদ ১৯৪৮ সালের দুর্যোগের সময়ও বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। সে সময় জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় লাখো ফিলিস্তিনির মতো তাঁর পরিবারও ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। পরে যুদ্ধবিরতির পর আবার শুজাইয়ায় ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু সাত দশকের বেশি সময় পর আবারও তাঁকে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রথম ও দ্বিতীয় দুর্যোগের মধ্যে কোনো তুলনাই হয় না।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান হামলায় তাঁর বাড়ি ও পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, একের পর এক হামলা ও উচ্ছেদ অভিযানে অন্তত ১০ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ফাতেমা ওবাইদ বলেন, তারা আমাদের বাড়িতে বোমা হামলা চালিয়ে আমার পরিবারের ৭০ জনের বেশি সদস্যকে হত্যা করেছে। আমার ছেলে, নাতি-নাতনি, ভাইপো-ভাইঝি সবাইকে হারিয়েছি।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের দুর্যোগের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। আর চলমান যুদ্ধে গাজায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।

ফাতেমা বলেন, এমন দিন গেছে, যখন এক ফোঁটা পানিও পাইনি। আমরা প্রতিটি চুমুক গুনে খেতাম। খাবার জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

তীব্র দুর্ভিক্ষ ও অবরোধের মধ্যেও গাজা শহর ছাড়তে রাজি হননি তিনি। তাঁর কথায়, জীবনের শেষে নিজের শহরের বাইরে সমাহিত হতে চাইনি। এত বছর পর আবার বাস্তুচ্যুত হয়েই মরতে চাই না।

নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর কথাও বলেন এই বৃদ্ধা। বিয়ের পোশাক, স্বামীর কাপড়, সংসারের পুরোনো জিনিস সবই ধ্বংস হয়েছে হামলায়। শুধু রয়ে গেছে বাবার দেওয়া একজোড়া কানের দুল।

তিনি বলেন, এগুলো আমি কখনো খুলিনি। এগুলো আমার বাবার স্মৃতি। দুই নাকবা পার হয়ে এগুলো টিকে আছে, অথচ আমার পরিবারের কত মানুষ আর বেঁচে নেই।

গাজায় ১৯৪৮ সালের দুর্যোগে জীবিত সাক্ষীদের মধ্যে এখন খুব কম মানুষই আছেন। চলমান যুদ্ধে হাজারো বয়স্ক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যারা বেঁচে আছেন, তাদের অনেকেই ক্ষুধা, চিকিৎসাসংকট ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

ফাতেমা ওবাইদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসে একটাই বেদনা নিজের ভূমি হারানোর যন্ত্রণা। তিনি বলেন, নিজের মাটি থেকে উৎখাত হওয়ার চেয়ে কষ্টের কিছু নেই। আর এত বছর পরও বাস্তুচ্যুত হয়েই মারা যেতে হবে এই চিন্তা সবচেয়ে ভয়ংকর।


শেয়ার করুনঃ

বিশ্বজুড়ে থেকে আরো পড়ুন

ফিলিস্তিন, গাজা, বিশ্বজুড়ে, ফাতেমা ওবাইদ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ