ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় বিদ্রোহ, খাদের কিনারায় প্রধানমন্ত্রী স্টারমার
বিশ্বজুড়ে
প্রকাশঃ ১২ মে, ২০২৬ ১:২৯ অপরাহ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ লেবার পার্টির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ নেতৃত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে খোদ মন্ত্রিসভার শীর্ষ স্তরে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ একদল প্রভাবশালী মন্ত্রী এখন সরাসরি দাবি তুলছেন, স্টারমারকে তাঁর পদত্যাগের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (এখনই ঘোষণা করতে হবে।
সোমবার সকালে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত ক্যাবিনেট বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ মন্ত্রিসভার সেই বিদ্রোহী অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা মনে করেন স্টারমারের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং জনমত পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে।
সংকট আরও ঘনীভূত হয় যখন ছয়জন সংসদীয় ব্যক্তিগত সচিব—যারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেন—একযোগে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠ জো মরিস এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির সহকারী মেলানি ওয়ার্ডও রয়েছেন। জো মরিস কড়া ভাষায় এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
লেবার পার্টির অভ্যন্তরে স্টারমার-বিরোধী মনোভাব এখন আর গোপন কোনো আলোচনা নয়। বর্তমানে অন্তত ৭২ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বা দ্রুত বিদায়ের সময়সীমা দাবি করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমপি ‘ব্লু লেবার’ ককাসের সদস্য। পেন্ডল ও ক্লিথেরোর এমপি জোনাথন হিল্ডার বিবিসি নিউজনাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কোনো প্রধানমন্ত্রী এই ধরনের বিদ্রোহের পর টিকতে পারেন না। স্টারমার কখনোই নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বোঝা।’
কেন এই জনরোষ? ব্রিটিশ রাজনীতির নতুন মানচিত্র
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলই মূলত এই বিদ্রোহের বারুদ জুগিয়েছে। ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর আসন হারিয়েছে।
নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ লেবারদের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। অন্যদিকে লন্ডন ও শহরাঞ্চলে গ্রিন পার্টিও লেবারদের ভোট কেড়ে নিয়েছে।
ওয়েলসে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা লেবার আধিপত্যের অবসান হয়েছে। স্কটল্যান্ডে ১২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৭টিতে জয় পাওয়াকে লেবারদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এত চাপের মুখেও কিয়ার স্টারমার নতি স্বীকার করতে নারাজ। গত রোববার এক আবেগঘন ভাষণে তিনি স্বীকার করেছেন, সরকার কিছু ভুল করেছে, তবে তাঁর দাবি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো তিনি সঠিকভাবেই নিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এখন আমার সরে যাওয়া মানে দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেওয়া।’ নিজের ক্ষমতা ফিরে পেতে তিনি ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণের মতো বড় পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও বিদ্রোহীদের মন গলেনি।
পরবর্তী নেতৃত্ব: বার্নহাম না স্ট্রিটিং?
স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী নিয়ে দলের ভেতরে এখন ত্রিমুখী লড়াই চলছে। ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে অনেকেই পরবর্তী নেতা হিসেবে দেখতে চান। তবে সমস্যা হলো, তিনি বর্তমানে এমপি নন। তাঁর সমর্থকেরা এমন একটি সময়সীমা চাচ্ছেন যাতে কোনো উপনির্বাচনের মাধ্যমে বার্নহাম পার্লামেন্টে ফিরে আসার সময় পান।
আবার দলের ডানপন্থী অংশ এবং অনেক বিদ্রোহী এমপি ওয়েস স্ট্রিটিংকে দ্রুত নেতৃত্বে দেখতে চাচ্ছেন যাতে বার্নহামের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ বন্ধ করা যায়। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারও কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সরাসরি বিদ্রোহ না করলেও বলেছেন, ‘দলকে শুধু কথায় নয়, কাজেও পরিবর্তন দেখাতে হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের রোববারের ভাষণ ছিল অত্যন্ত ‘টোন ডেফ’ বা বাস্তববিবর্জিত। ভোটাররা যখন জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ব্রেক্সিট পরবর্তী সংকট নিয়ে চিন্তিত, তখন স্টারমার পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছেন যা সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। মঙ্গলবারের ক্যাবিনেট বৈঠক শেষে যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বা অন্য কোনো শীর্ষ মন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তবে সেটিই হবে স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বের কফিনে শেষ পেরেক।
ব্রিটেনের ভাগ্য এখন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে। সেপ্টেম্বর নাগাদ নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা এখন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য, রাজনীতি, ইতিহাস