১১ মে ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / জীববৈচিত্র

গাছ-বাঁশ পাচারে বিপর্যস্ত মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চল

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার

প্রকাশঃ ১১ মে, ২০২৬ ১:৪৮ অপরাহ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জেলা মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো এখন বন উজাড়ের বড় হুমকির মুখে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বন বিভাগের চারটি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অবাধে গাছ, বাঁশ ও বেত কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের পাশাপাশি রাতেও সংঘবদ্ধভাবে বন থেকে মূল্যবান বনজ সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মকাণ্ডে একদিকে যেমন সংরক্ষিত বনভূমির পরিধি কমছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য।


বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বন বিভাগের মোট চারটি রেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় রাজকান্দি রেঞ্জ, যেখানে লাউয়াছড়া, চম্পারায়, বাঘাছড়া, ডালুয়াছড়া, কুরমাছড়া, সোনারাইছড়া ও সুনছড়াসহ বেশ কয়েকটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। এছাড়া জুড়ী রেঞ্জের আওতায় রয়েছে সুরমাছড়া, রাগনাছড়া, পুটিছড়া, পূর্ব গোয়ালী, ধলাইছড়া ও সাগরনাল। বড়লেখা রেঞ্জে রয়েছে লাটুছড়া, হাতমাছড়া, নিকুড়িছড়া ও মাধবছড়া। অন্যদিকে কুলাউড়া রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম গোগালী, ছোট কালাইগিরি, বেগুনছড়া, লবণছড়া ও বড় কালাইগিরি বনাঞ্চল।


সম্প্রতি কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর বিটের কোনাগাঁও এলাকায় সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়াটিকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ পরিবহন পদ্ধতিতে বাঁশ সরানোর কাজ চলছে। বনের গভীর অংশ থেকে কেটে আনা বাঁশগুলো প্রথমে ছড়ার পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা পানির স্বাভাবিক স্রোতের সঙ্গে সেগুলো নিচের দিকের একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে জমা হয়।


ছড়ার ওপর নির্মিত একটি ছোট সেতুর কাছে কয়েকজন শ্রমিক বাঁশগুলো পানির ভেতর থেকে টেনে ওপরে তুলেন। পরে সেগুলো সড়কের পাশে নিয়ে এসে ভাগ ভাগ করে স্তূপ আকারে রাখা হচ্ছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, এই স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে বাঁশ জমা ও পরিবহনের কার্যক্রম চলে আসছে।


তারা আরও জানান, কিছু সময় পর সেই স্তূপ করা বাঁশ ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ পরিবহনের আড়ালে বনাঞ্চলের ভেতর থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বলে।


এ সময় বাঁশ ওঠানোর কাজে যুক্ত থাকা আহাদ মিয়া নামের এক ব্যক্তি জানান, তারা যে বাঁশগুলো পরিবহন করছেন, সেগুলো সংরক্ষিত বন থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। তার দাবি, স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন বাড়ি থেকে কেনা বাঁশগুলোই ছড়ার পানিতে ভাসিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে আনা হয়েছে। পরে সেখান থেকে শ্রমিকরা বাঁশগুলো তুলে সড়কের পাশে স্তূপ করছেন এবং সেগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


তবে স্থানীয় বাসিন্দারা আহাদ মিয়ার এই দাবির সঙ্গে একমত নন। তাদের দাবি, বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব বাঁশ মূলত সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর থেকেই কেটে আনা হয়েছে। স্থানীয়দের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যে ছড়াটিকে ব্যবহার করে বাঁশ পরিবহন করা হচ্ছে, সেটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি প্রাকৃতিক জলধারা। ফলে বনের অভ্যন্তর থেকেই এসব বাঁশ কেটে এনে পানির স্রোতের মাধ্যমে নিচের দিকে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।


তারা আরও বলেন, ছড়ায় সাধারণত বর্ষাকালে বা টানা বৃষ্টির সময়ই প্রবল স্রোত দেখা যায়, তখনই কিছু জিনিস ভেসে আসতে পারে। কিন্তু বছরের অন্য সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় এই ছড়ায় বাঁশ ভেসে আসা বা এভাবে বড় পরিমাণে বাঁশ পরিবহন হওয়ার কোনো বাস্তব কারণ নেই। তাই তাঁদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একই কৌশল ব্যবহার করে বন থেকে গাছ ও বাঁশ কেটে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা বনাঞ্চলের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


শুধু রাজকান্দি রেঞ্জেই নয়, একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে জেলার জুড়ী, বড়লেখা ও কুলাউড়া রেঞ্জ এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরেও। এদিকে লাউয়াছড়া বন এলাকায় সরেজমিনে অর্ধশতাধিক গাছ কেটে ফেলার চিহ্নও পাওয়া গেছে। এতে একদিকে বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্য প্রাণীদের আবাসস্থলও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, বনের গাছ ও বাঁশ পাচারের সঙ্গে জড়িতরা শুধু বনভূমির ক্ষতিই করছে না, বরং পুরো পরিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, বন সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো যদি আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে বন উজাড়ের ঘটনা আরও বেড়ে যেতে পারে।


এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে সব বনাঞ্চলে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু চক্র বন থেকে গাছ ও বাঁশ চুরির সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অপরাধ রোধে বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

মৌলভীবাজার বন উজাড়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বনাঞ্চল ধ্বংস, জীববৈচিত্র্য হুমকি, গাছ চুরি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ