বিনা অনুমতিতে হাওরের বাঁধ কাটলে আইনি ব্যবস্থা, সতর্ক করল প্রশাসন
কৃষি
প্রকাশঃ ২৮ মার্চ, ২০২৬ ১০:২১ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম ঘনিয়ে আসতেই নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। জেলায় বর্তমানে ৫৭৭টি ধান কাটার মেশিন সচল থাকলেও সবকটিই ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকট ধান কাটায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগামী মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভার আয়োজন করেছে জেলা কৃষি অফিস।
এদিকে, অতিবৃষ্টির কারণে সময়মতো ধান তোলা নিয়েও কৃষকদের মধ্যে শঙ্কার শেষ নেই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাওরে জমে থাকা পানিতে ধানের চারা তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় হাওরের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেশিন দিয়ে সেচে পানি কমানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। সবমিলিয়ে বোরো ধান নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে কৃষক পরিবারে।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে বিভিন্ন হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার সামান্য বেশি। এবছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
জানা গেছে, কৃষি বিভাগের উদ্যোগে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে সরবরাহ করা কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলে দ্রুত ধান কাটার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে। কৃষকদের তথ্যমতে, আবাদ করা ধানের প্রায় ৫০ শতাংশ মেশিন দিয়ে কাটা হয়। বাকি ৫০ শতাংশ শ্রমিকরা নিজেরা কেটে তোলেন।
জেলা কৃষি অফিস ষূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৮৭৬টি কম্বাইন হারভেস্টার রয়েছে। বর্তমানে এর মধ্যে সচল রয়েছে ৫৭৭টি এবং ২৯৯টি বিভিন্ন কারণে অচল হয়ে গেছে। অচল মেশিনগুলোর মধ্যে ১৩৫টি মেরামতযোগ্য বাকিগুলো সম্পূর্ণ মেরামতের অযোগ্য বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ২১৯টি রিপার মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে সচল রয়েছে ১৪৬টি, মেরামতযোগ্য ৪৫টি এবং ২৮টি মেশিন সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, যেসব মেশিন মেরামতযোগ্য সেগুলো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, আগামী সপ্তাহ বা পরের সপ্তাহে ধান কাটা শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে অচল মেশিন সচল করার সম্ভাবনা খুবই কম।
হাওরপাড়ের কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো বিকল মেশিনগুলো মেরামত করা না গেলে ধান কাটায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা আগাম পানি ঢোকার ঝুঁকি থাকায় দ্রুত ধান কাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শাল্লা উপজেলার কৃষক সুজন মিয়া বলেন, হাওরে ধান কাটার সবকটি মেশিনই ডিজেলচালিত। এসব মেশিন দিয়ে গড়ে ৫০ শতাংশ ধান দ্রুততম সময়ে কাটা হয়। কিন্তু এবার জ্বালানি সংকটের কারণে এই মেশিনগুলো ব্যবহার করা যাবে কী না শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, যদি জ্বালানি তেলের সংকট না কাটে তাহলে, কৃষকরা বিপাকে পড়ে যাবেন। কারণ এবছর অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে এখনই বিভিন্ন হাওরে ধান তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি না ধরলে বড় ধরণের ক্ষতি হতে পারে।
তাহিরপুর উপজেলার কৃষক ফয়সল আবেদিন বলেন, এবার অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে শুরুতেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে বিভিন্ন হাওরে ফসল তলিয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক স্থানে ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। যদি বৃষ্টি না থামে তাহলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, হাওরে ধান কাটার সবকটি মেশিন ডিজেলচালিত। জ্বালানি সংকটের কারণে শঙ্কা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৩১ মার্চ মেশিন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় পরবর্তী করণীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার সামান্য বেশি। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। ধান কাটার মৌসুম সামনে রেখে আমরা কৃষিযন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। যেসব মেশিন মেরামতযোগ্য, সেগুলো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু পুরোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে এর প্রভাব কতটা হবে, তা সময়ই বলে দেবে।’
সুনামগঞ্জ হাওর, বোরো ধান, জ্বালানি সংকট, ধান কাটার মেশিন, কৃষকের দুশ্চিন্তা