১০ জুন ২০২৬

বিশ্বজুড়ে

খামেনি হত্যার পর উত্তেজনা: কেন ইসরায়েলে হামলার সিদ্ধান্ত নিল হিজবুল্লাহ

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ৪ মার্চ, ২০২৬ ৫:২৩ অপরাহ্ন

ছবিঃ বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্থানে ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করছেন এক দমকলকর্মী।

আরবভিত্তিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ওপর হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক হামলা শুধু ২০২৪ সালের যুদ্ধের পর অনেকটা নিস্তেজ হয়ে থাকা সীমান্ত সংঘাতকে আবার উসকে দেয়নি বরং এটি ইসরায়েলের ব্যাপক পাল্টা হামলার সূচনা করেছে। লেবাননের জনমতকে নাড়া দিয়েছে এবং দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সংঘাতের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সোমবার হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। তারা জানায়, এই হামলা করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এবং “লেবাননের প্রতিরক্ষায়”। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইসরায়েলে হামলার দায় স্বীকার করল হিজবুল্লাহ।

এর জবাবে ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ লেবানন ও পূর্ব লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন নিহত ও ২৪৬ জন আহত হয়েছে। হামলার এলাকাগুলো থেকে মানুষজন পালিয়ে যাওয়ায় সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে, যা অনেককে ২০২৪ সালের শেষের দিকে হওয়া ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তবে লেবাননের মানুষের জন্য বড় ধাক্কাটি এসেছে দেশের ভেতর থেকেই।

সেই দিন জরুরি বৈঠকে লেবাননের মন্ত্রিসভা প্রচলিত সতর্ক ভাষার বাইরে গিয়ে এক কঠোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন এবং সংগঠনটিকে অস্ত্র জমা দিতে বলেন।

তিনি বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে।

সরকার সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেয় লেবাননের ভূখণ্ড থেকে রকেট বা ড্রোন হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে এবং আইন ভঙ্গকারীদের গ্রেপ্তার করতে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি।

লেবাননের আরেক বড় শিয়া রাজনৈতিক দল আমাল আন্দোলনের নেতা বেরি দীর্ঘদিন ধরেই হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাই অনেকের কাছে এটি দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের বিচ্ছেদ বলে মনে হয়েছে।

তবে বেরির অবস্থান ও হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো বলছে, শিয়া রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরের বাস্তবতা আসলে আরও জটিল।

যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে দ্বিধা


বেরির ঘনিষ্ঠ দুইটি সূত্র জানায়, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও বেরি ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যোগাযোগ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, ইসরায়েলের নতুন হামলা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠছে।

বেরির মতে, যুদ্ধ যদি আসন্নই হয়, তাহলে লেবানন যেন ইসরায়েলকে হামলার অজুহাত না দেয়।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বলা হয়, খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিক্রিয়া দেখানো আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, তারা হামলা করুক বা নীরব থাকুক ইসরায়েলি উত্তেজনা যেকোনোভাবেই বাড়বে।

যুদ্ধবিরতির পর থেকে সংগঠনটির প্রকাশ্য বক্তব্যেও এই অবস্থানের ইঙ্গিত ছিল।

হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেম বলেন, তারা লেবাননের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইসরায়েল যদি আবার বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে “ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র পড়বে।”

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের যুদ্ধে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর সংগঠনের নেতৃত্ব এমন একটি আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহের অপেক্ষায় ছিল, যা যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

সূত্রটি বলে, “ইরানের ওপর হামলাই সেই বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হয়ে ওঠে।”

তার ভাষায়, যুদ্ধের বাইরে থাকলে হিজবুল্লাহ নিষ্ক্রিয় মনে হতো এবং যুদ্ধবিরতির পর আরোপিত শর্তগুলো চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ হারাত।

বেরির জন্য একটি ‘পালানোর পথ’


হিজবুল্লাহ ও আমাল আন্দোলনের জোট ১৯৯০ সালে গৃহযুদ্ধের পর থেকে লেবাননের শিয়া রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

১৯৮০ সাল থেকে আমাল আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন নাবিহ বেরি। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় শিয়াদের জন্য বরাদ্দ সর্বোচ্চ পদ।

তবে সূত্রগুলো বলছে, হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তে বেরির সমর্থনকে সরাসরি বিচ্ছেদ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়।

তাদের মতে, বেরি যেন হিজবুল্লাহ থেকে দূরে অবস্থান নিয়েছেন এমন একটি চিত্র তৈরি করা ছিল রাজনৈতিকভাবে হিসাব করা একটি কৌশল।

এর ফলে যদি সংঘাতে হিজবুল্লাহ বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়ে, তাহলে বেরি নিজেকে এমন একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন, যিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে সক্ষম।

সামনে কী?


২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর বড় ক্ষতির পর এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেবাননের রাষ্ট্র এখন প্রথমবারের মতো সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—শুধু রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নয়, বরং লেবাননের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও।

বৈরুত থেকে যে বার্তা এখন স্পষ্ট আগের সেই ব্যবস্থা, যেখানে কখন যুদ্ধ হবে তা ঠিক করত হিজবুল্লাহ আর তার ফল সামাল দিত রাষ্ট্র, সেই সমীকরণ এখন সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে।


শেয়ার করুনঃ

বিশ্বজুড়ে থেকে আরো পড়ুন

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, লেবানন, হিজবুল্লাহর

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ