যুদ্ধের ১০০ দিন পরও টিকে আছে তেহরান
বিশ্বজুড়ে
প্রকাশঃ ১০ জুন, ২০২৬ ৫:৩১ অপরাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার একশ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ব্যাপক বিমান হামলা, অর্থনৈতিক চাপ, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং কৌশলগত অবরোধের মুখেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। বরং যুদ্ধের শুরুতে যে হারে সরকার পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছিল, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরুর পর অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়বে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা দুর্বল হয়েছে।
বিভিন্ন পূর্বাভাসভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, এখন অধিকাংশ পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, অন্তত স্বল্পমেয়াদে ইরানি সরকার পতনের ঝুঁকিতে নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক সংকট ইরানের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্য দিয়েও টিকে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির শাসকগোষ্ঠীর।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউফান সেন্টারের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ক্যারোলিন রোজের মতে, ইরানের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হলেও এটিকে এখনই সরকারের অস্তিত্বের জন্য চূড়ান্ত হুমকি বলা যাচ্ছে না।
তাঁর ভাষায়, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা অতীতে নিষেধাজ্ঞা, পানিসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সামাজিক অসন্তোষের মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে।’
দেশটির অভ্যন্তর থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের চিত্র উঠে এসেছে। যুদ্ধের শুরুতে অনেকেই আশা করেছিলেন, হামলার ফলে সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু দীর্ঘ সংঘাত, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় সেই আশা অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন অনেক ইরানি নাগরিক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবে এই অসন্তোষ এখনো সরকারবিরোধী শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার অভিযান এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের গণআন্দোলন গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার জন জেনকিন্সের মতে, ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদনে ধস, তেল রপ্তানিতে চাপ এবং দীর্ঘদিনের পানিসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তবে তিনি মনে করেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতা এবং বিরোধী কর্মকাণ্ডের ওপর দমন-পীড়নের কারণে সরকার আপাতত টিকে থাকতে সক্ষম হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নের কিছু ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা সামলেও ইরান তার উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি মেরামত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের আগের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের বড় অংশ এবং মোবাইল লঞ্চার এখনো কার্যকর রয়েছে।
এ তথ্যগুলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এমন মার্কিন দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু গথর্প মনে করেন, বর্তমানে ইরান সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং আসন্ন নির্বাচনী বাস্তবতা ওয়াশিংটনকে দ্রুত সমাধানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান মনে করছে, সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, তত বেশি কূটনৈতিক ছাড় আদায় করা সম্ভব হবে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, এখন মূল প্রশ্ন সরকার টিকবে কি না, তা নয়; বরং যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে।
তাঁর মতে, ইরানের নেতৃত্ব বুঝতে পারছে শুধু টিকে থাকাই যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে, একটি প্রাথমিক সমঝোতা, দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু অনিশ্চিত আলোচনার প্রক্রিয়া, অথবা ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন এক অচলাবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে ইতিবাচক পরিস্থিতি হবে যদি একটি সমঝোতার মাধ্যমে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমাধানের পথ তৈরি হয়। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা, সীমিত সংঘাত এবং নতুন উত্তেজনার ঝুঁকিতে থাকবে।
যুদ্ধের একশ দিনের বেশি সময় পর চিত্রটি স্পষ্ট, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তবে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু তার টিকে থাকার ক্ষমতা নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার শর্ত এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, যুদ্ধ, তেহরান