ইরানের সস্তা ড্রোন, ব্যয়বহুল জবাব: অর্থনৈতিক চাপের মুখে উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা
বিশ্বজুড়ে
প্রকাশঃ ৩ মার্চ, ২০২৬ ৩:১২ অপরাহ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন এক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলো উচ্চ হারে আক্রমণ প্রতিহত করলেও এর আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি কেবল সামরিক সংঘাত নয়; বরং একটি পরিকল্পিত আর্থিক ক্ষয়যুদ্ধ।
রোববার পর্যন্ত ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ভূপাতিত করা হয়েছে। কাতারও জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য করে ছোড়া প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। প্রতিরোধের হার ৯০ শতাংশের বেশি।
আরবভিত্তিক গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’ এ করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক দিক থেকে এটি বড় সাফল্য হলেও অর্থনৈতিক হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের হিসাবে, একটি ইরানি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ ১০ থেকে ২০ লাখ ডলারের মধ্যে। সে হিসাবে আমিরাতের বিরুদ্ধে ইরানের মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮০ থেকে ৩৬০ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, এসব হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এক সপ্তাহান্তেই আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যয় ১.৫ থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে—যা ইরানের ব্যয়ের পাঁচ থেকে দশ গুণ।
একজন সামরিক বিশ্লেষক পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন, ফেরারি গাড়ি দিয়ে ই-বাইক ধাওয়া করার মতো।
সস্তা ড্রোন দিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলার কৌশল নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াও অনুরূপ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ড্রোন দ্রুত ও কম খরচে উৎপাদন করা যায়, কিন্তু সেগুলো ভূপাতিত করতে যে প্রযুক্তি প্রয়োজন, তা ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যায় মজুত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—কার মজুত আগে ফুরাবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক রয়েছে সৌদি আরবের। তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত থাড ও প্যাট্রিয়ট PAC-3 ব্যবস্থা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। ওমানের প্রতিরক্ষা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তবে এসব ব্যবস্থার সরবরাহ ও পুনর্মজুত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন লাইনের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করেছে। এটি সত্য হলে ব্যালিস্টিক হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু সস্তা ও বহুল উৎপাদনযোগ্য ড্রোনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের কৌশল সরাসরি সামরিক জয়ের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। প্রতিটি প্রতিরোধ সফল হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো উচ্চ হারে আক্রমণ প্রতিহত করতে পারছে। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও মজুতের চাপ বাড়বে। সেই সঙ্গে জনমত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্নও সামনে আসবে।
অতএব, আকাশে সাফল্য থাকলেও যুদ্ধের আরেকটি অদৃশ্য ফ্রন্ট অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ আগে ক্লান্ত হবে, সেই সমীকরণই নির্ধারণ করতে পারে সংঘাতের গতি।
মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র