ছবিঃ সিলেট ভয়েস

চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন উৎপাদন শুনতে একটি সাধারণ শিল্পকার্যক্রম মনে হলেও বাস্তবে এটি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা এসব চুনের ভাটার বিস্তার এলাকাটিকে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

চুন উৎপাদনের এই প্রক্রিয়ায় বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে। যা ফসল ও গাছপালার ক্ষতি করছে। শিশু ও বয়স্ক মানুষদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসজনিত রোগ বাড়ছে। 

একই সঙ্গে জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে গাছ কেটে ব্যবহার করায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে-যার পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা কঠিন হলেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বর্তমানে ছাতকজুড়ে এ ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী চুনের ভাটা শতাধিক। স্থানীয়ভাবে ‘চুন পাজা’ নামে পরিচিত এসব ভাটা কোনো পরিবেশগত বা নিরাপত্তা নীতিমালা না মেনেই গড়ে উঠেছে। কেবল সড়কের পাশেই নয়, গ্রামীণ বসতবাড়ির ভেতরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছিও এসব ভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এতে করে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে শিক্ষার্থীরাও। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই এলাকাটি একটি অঘোষিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব এবং একটি পলিউশন হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অবৈজ্ঞানিক চুল্লিগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং ‘ফ্লাই-অ্যাশ’ পরিবেশে মারাত্মক বিষ ছড়াচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় জনসমষ্টির মধ্যে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পাজু ব্যবসায়ীরা বলছেন-স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে তারা এগুলো পরিচালনা করছেন। কিন্তু প্রশাসন বলছে- এসবের কোনো অনুমোদন নেই। খুব দ্রুত এসব ভাটা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।  

জানা যায়, বছরখানেক আগেও ছাতক উপজেলায় চুন পাজার সংখ্যা ছিল ১৮ থেকে ২০টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০টিতে। আগে এসব পাজা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও এখন তা দাপুটের সঙ্গে বসানো হয়েছে মূল সড়কের পাশে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গা ঘেঁষেও রয়েছে বেশ কয়েকটি পাজু। এসব ভাটার কোনোটিরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেই। স্থানীয় প্রশাসনেরও নেই কোনো তদারকি। 

এখানেই শেষ না। ভাটাগুলোতে উচ্চ তাপে চুনাপাথর পোড়ানোর জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের ডালপালা কেটে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি ভাটাতে স্তুপ স্তুপ বড় বড় গাছের টুকরো ও ডালপালা রয়েছে। এতে করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে অঞ্চলের সবুজ প্রকৃতি। মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুন তৈরির জ্বালানি হিসেবে অবাধে গাছপালা কাটায় পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে ভাটার চুল্লি থেকে নির্গত সালফারযুক্ত ধোঁয়া এবং সাদা চুনের ধুলিকণা আশপাশের কৃষিজমির ওপর স্তরে স্তরে জমা হচ্ছে। এতে মাটির গুণগত কমে গিয়ে উর্বরতা হারিয়ে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তাছাড়াও পাজা থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে এলাকায় বাড়তে পারে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের জটিল রোগ। দীর্ঘমেয়াদে এই ধোঁয়া ও ধুলার সংস্পর্শে থাকায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিল্প এলাকা হিসেবে খ্যাত ছাতকের আনাচে-কানাচে গড়ে এসব অবৈধ চুনাপাথর পোড়ানোর ভাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যোগ দিচ্ছেন এই ব্যবসায়। এতে করে একটি বড় সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। যাদের কাছে স্থানীয় প্রশাসনও অনেকটা ‘অসহায়’ হয়ে পড়েছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে জীবন ও জীবিকার হুমকিতে পড়তে হচ্ছে। ফলে এক প্রকার নিরুপায় হয়েই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

চুন ব্যবসায়ী ও পাজুর মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অনেকে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা করে যাচ্ছেন। নতুন করে আরও অনেকে যুক্ত হচ্ছেন। বর্তমানে অন্তত একশ থেকে দেড়শো পাজু (ভাটা) রয়েছে। একেক ভাটা থেকে মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার মণ চুন সরবরাহ করা যায়। 

তিনি বলেন, এই ব্যবসাটি অনেকদিন মন্দা ছিল। মাঝখানে কিছুটা ভালো হয়েছে। গ্যাসের লাইন ছিল। গ্যাস সংযোগ না থাকায় এই ব্যবসা ভালো। কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন সমিল থেকে উচ্ছিষ্ট কাট ব্যবহার করা হয়।

এই অবৈধ চুনের কারবার নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে ‘পাজু কমিটি’ নামে সংগঠনও রয়েছে। কমিটির সভাপতি ছাতক পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড সাবেক কাউন্সিলর ছালেক মিয়া। তিনি বলেন, তিনি ও তার কমিটির ১২-১৩ জন সদস্য পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছেন। 

তবে ছাতক উপজেলা প্রশাসন বলছে, কাউকে এই ব্যবসার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, এ বিষয় নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা হয়েছে। খুব শীঘ্রই অবৈধ চুন ভাটা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে। 

ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, তিনি কোনো পাজুর অনুমোদন দেন নি। আগে দেওয়া হয়েছে কী না খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছেন। 

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকাটি একটি অঘোষিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব এবং একটি পলিউশন হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অবৈজ্ঞানিক চুল্লিগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং ফ্লাই-অ্যাশ পরিবেশে মারাত্মক বিষ ছড়াচ্ছে। এর ফলে মাইক্রো লেভেলে অর্থাৎ স্থানীয় জনসমষ্টির মধ্যে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পাথরের ধুলোবালি ও আগুনের ডাস্ট বাতাসে মিশে মানুষের শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি মূলত স্থানীয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ঘটছে এবং এর ফলে এলাকার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ 

ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি হিসেবে গাছ পোড়ানোর ফলে ব্যাপক বৃক্ষনিধন হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে সাময়িকভাবে কিছু মানুষের অর্থনৈতিক লাভ হলেও বৃদ্ধ এবং শিশুদের জন্য এটি বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তাই স্থানীয় প্রশাসনের উচিত নজরদারি বাড়ানো এবং এই খাতকে একটি পরিকল্পিত এসএমই বা মাঝারি মানের শিল্পে রূপান্তর করা। এতে সরকার রাজস্ব পাবে এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘গত মাসে আমি ছাতক উপজেলা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। তখন বিষযটি আমার নজরে এসেছে। এসব ভাটা তৈরিতে উপজেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর কোনটির অনুমোদন নেই। 

তিনি বলেন, ‘অবৈধ চুনের ভাটা ভেঙে ফেলতে সংশ্লিষ্টদের নোটিশ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালককে আমি বলেছিলাম। এটা ওই পর্যায়েই রয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখছি এখন কোন অবস্থায় আছে এবং এ বিষয়ে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

ছাতক, চুন, ধোঁয়া, বিপর্যস্ত, পরিবেশ, হুমকি, জনস্বাস্থ্য, ঝুঁকি