আল হারামাইন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু: ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অনুসন্ধান
প্রকাশঃ ৭ নভেম্বর, ২০২৫ ১০:২০ পূর্বাহ্ন
সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু চোরাচালান। ভারতের খামারে লালন-পালন করা গরু-মহিষ তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় সরকারকে শুল্ক না দিয়েই অবৈধভাবে সেগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এই প্রবণতা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে দোয়ারাবাজার ও মধ্যনগর উপজেলার সীমান্তে।
চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যে একের পর এক দেশীয় খামার লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিজিবি ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সীমান্ত এলাকা থেকে হাজারেরও বেশি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের বাদেসাদকপুর গ্রামের ইকবাল হোসেন স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি না খুঁজে গরু মোটাতাজাকরণের খামার গড়ে তুলেছিলেন। ২৭ লাখ টাকার পুঁজির খামারে প্রথমে মুনাফা পেলেও ভারতীয় গরুর স্রোতে বাজারে দামের পতন ঘটলে তিনি লোকসানের মুখে পড়েন তিনি।
ইকবাল হোসেন বলেন, ‘চোরাচালানের গরুর কারণে আমরা টিকতে পারিনি। সাড়ে ৭ লাখ টাকা লোকসান গুনে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হই।’
একই অভিজ্ঞতা সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের খামারি ও সুনামগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. দারু মিয়ার।
তিনি বলেন, ‘আমার খামারে ২২টি গরু ছিল। ভারতীয় গরুর কারণে বাজারে দামের ধস নামে। লোকসানের কারণে খামার বন্ধ করতে হয়েছে। শুধু আমি নই, আমাদের গ্রামের মুজিব ও আমিন এগ্রো ফার্মও একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।’
প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও খামারি সংগঠন কেউই জানাতে পারেনি, কতগুলো খামার বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সবার এক কথা-অবৈধ ভারতীয় গরুর আগ্রাসনে দেশীয় খামার ব্যবসা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা সুনামগঞ্জ। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ হাওর ও নদীনালা ঘেরা এক অনন্য ভূপ্রকৃতির অঞ্চল। জেলার উত্তর ও পশ্চিম দিক জুড়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। দীর্ঘ এই সীমান্ত রক্ষায় বিজিবির ১৯টি বিওপি থাকলেও সীমান্তে চোরাকারবারিরা সক্রিয়।
বিশেষ করে দোয়ারাবাজার, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও ছাতক উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে অসংখ্য নদীপথ, ছড়া, পাহাড়ি টিলা ও জনবসতিহীন ফাঁকা এলাকা রয়েছে। এসব স্থান সীমান্তরক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বর্ষায় অনেক জায়গা নৌকাবিহীনভাবে অগম্য হয়ে পড়ে, আবার শুষ্ক মৌসুমে শুকনো নদীপথ নতুন রুট তৈরি করে যা চোরাকারবারিদের জন্য আদর্শ পরিবেশ।
এই ভৌগোলিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে গরু চোরাচালান চক্র। ভারতের মেঘালয়ের খামারগুলোতে লালন-পালন করা গরু-মহিষ তুলনামূলক সস্তা হওয়ায়, সেগুলো শুল্ক না দিয়েই অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে আসছে। সীমান্তবর্তী বাজার ও খামারের কিছু অসাধু ইজারাদার ও ব্যবসায়ীর যোগসাজশে এসব গরু ‘বৈধতা’ পেয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পশুর হাটগুলোতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি গরু চোরাচালান হয় দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে। সেখানে কয়েকটি পশুর হাট ও খামারের মালিকদের যোগসাজশে অবৈধ গরুর বৈধতা দেওয়া হয়।
বিজিবির তথ্যমতে, সীমান্তের ছয় উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরু চোরাচালানের চেষ্টা হয় দোয়ারাবাজার ও মধ্যনগর দিয়ে। বৈধতার আড়ালে এই গরুগুলো বিক্রি হয় বোগলা বাজার, বাংলাবাজার, নরসিংহপুর এবং মহেষখলা বাজারে।
জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জের বাসিন্দা সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘সীমান্তে প্রতিনিয়তই চোরাচালান চলে কখনও কম, কখনও বেশি। বিজিবিকে পুরোপুরি দায়ী করা যায় না, তবে দায়মুক্তিও দেওয়া যায় না। কিছু এলাকায় চোরাকারবারিরা আগেই টহলের খবর পেয়ে যায়। সৎ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রিত হয়। বিজিবির সক্রিয় ভূমিকা থাকলে এটি রোধ করা সম্ভব।’
টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সুনামগঞ্জ সভাপতি অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে দুই দিকেই চোরাচালান চলে। বিজিবি গরু জব্দ করলেও এটি বন্ধ হচ্ছে না। এদের আইনের আওতায় আনতে হবে, না হলে চিহ্নিত করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে খামারিরা রক্ষা পাবে, সরকারও রাজস্ব পাবে।’
সুনামগঞ্জ কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের উপকমিশনার মো. আব্দুল হান্নান জানান, গত এক বছরে সীমান্ত থেকে জব্দ করা ১১৬টি গরু-মহিষ থেকে প্রায় ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তে বেড়া না থাকায় ভারতীয় গরু সহজেই প্রবেশ করে। দোয়ারাবাজার সীমান্তের হাটে এসব গরু বৈধতা পায়। এতে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে এবং দেশীয় খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকার এটি ঠেকাতে কাজ করছে। বোগলা বাজারে আমাদের তিনজন কর্মকর্তা নিয়মিত দায়িত্বে আছেন এবং খামারগুলোতেও নজরদারি চলছে।’
বিজিবির সুনামগঞ্জ ২৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বলেন, ‘সীমান্ত দুর্গম হওয়ায় টহল কার্যক্রমে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। তবুও চোরাচালান রোধে আমরা দিন-রাত কাজ করছি। দোয়ারাবাজার সীমান্তের কাছাকাছি পশুর হাট থাকায় চোরাকারবারিরা সুবিধা নেয়। এসব হাট সরানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে সীমান্ত থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার গরু জব্দ করেছি। নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।’
দোয়ারাবাজার উপজেলার হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ বলেন, ‘ভারতীয় গরু কিছুদিন খামারে রেখে পরে সীমান্তবর্তী হাটে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ দায়িত্বশীল ভূমিকা নিলে টাস্কফোর্সের কাজ সহজ হবে। বোগলা, বাংলাবাজার ও নরসিংপুর এই তিনটি পশুর হাট নিয়ে অভিযোগ আছে। সীমান্ত থেকে হাট সরানোর বিষয়ে যাচাই চলছে। প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে।’
সুনামগঞ্জ, সীমান্ত, বেপরোয়া, ভারতীয়, গরু চোরাচালান, ক্ষতিগ্রস্ত, দেশীয়, খামার