আল হারামাইন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু: ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অনুসন্ধান
জব্দ করা চোলাই মদও বিক্রির অভিযোগ
প্রকাশঃ ২৭ অক্টোবর ২০২৫
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামের বেড়িবাঁধে মাদক বিরোধী অভিযান চালায় মার্কুলি নৌ-পুলিশ। অভিযানে তিনটি মোটরসাইকেল ও ২০০ লিটার চোলাই মদসহ পাপন সরকার নামে এক যুবককে আটক করা হয়। গত ১৯ অক্টোবর আনুমানিক রাত সাড়ে এগারোটার দিকে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পরদিন মার্কুলি নৌ-পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রুকনুজ্জামান বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার জব্দ তালিকায় আটক আসামীর সঙ্গে ৪৮ লিটার চোলাই মদ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের সময় জব্দ করা তিনটি মোটরসাইকেল ও আরও প্রায় দেড়শো লিটার চোলাই মদ জব্দ তালিকায় দেখানো হয়নি।
এমনকি ঘটনার এক সপ্তাহ পরও তিনটি মোটরসাইকেলের কোনো হদিস নেই। সূত্র বলছে, অভিযানের সময় জব্দ করা তিনটি মোটরসাইকেলের মধ্যে পুলিশ সদস্যরা দুইটি মোটরসাইকেল নিজেরাই চালিয়ে এবং একটি নৌকায় করে থানাতে নিয়ে যান। মামলা দায়েরে পর তিনদিন পর্যন্ত মোটরসাইকেল তিনটি তাদের হেফাজতে ছিল।
তবে গত শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) সরজমিনে থানায় গেলে কোনো মোটরসাইকেল দেখতে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ ওঠেছে, অভিযানের সময় জব্দ করা প্রায় দেড়শো লিটার চোলাই মদ পাহাড়পুরের একজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেছে নৌ-পুলিশ সদস্যরা। এছাড়াও জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে মোটরসাইকেল তিনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চোরাকারবারীদের নিকট মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোরাকারবারিদের সঙ্গে রফাদফা না হওয়ায় মোটরসাইকেল তিনটি উধাও করে ফেলা হয়।
এছাড়াও অভিযানের সময় আর্থিক সুবিধা নিয়ে আরও কয়েকজন চোরাকারবারীকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সহযোগীতার অভিযোগ ওঠেছে নৌ-পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা না বলে এড়িয়ে যান মার্কুলি নৌ-পুলিশের পরিদর্শক কাওসার গাজী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৯ অক্টোবর রাতে নির্ধারিত সীমানার বাহিরে গিয়ে শাল্লা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের পাশে অভিযান চালায় হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার অধীনস্থ মার্কুলি নৌ-পুলিশ। অভিযানে শাল্লা উপজেলার মৌরাপুর গ্রামের পাপন সরকার (২২) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
চোরাকারবারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অভিযানের সময় তিনটি মোটরসাইকেল ও প্রায় দুইশো লিটার চোলাই মদ জব্দ করা হয়। পরদিন ২০ অক্টোবর মার্কুলি নৌ-পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রুকনুজ্জামান বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার জব্দ তালিকায় শুধুমাত্র ৪৮ লিটার চোলাই মদের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সূত্র বলছে, এ ঘটনার সঙ্গে শাল্লা উপজেলার বিলপুর গ্রামের মন্টু দাসের ছেলে সুহেল দাস (২০) সহ অন্তত আরো পাঁচজন জড়িত থাকলেও অদৃশ্য কারনে মামলার এজাহারে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র আরও জানায়, চোলাই মদ পরিবহনে থাকা মোটরসাইকেলগুলো জব্দ তালিকায় না রেখে এগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে চোরাকারবারীদের নিকট মোটা অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়। এই পুরো ঘটনার সঙ্গে মার্কুলি নৌ-পুলিশের পরিদর্শক কাওসার গাজী ছাড়াও উপপরিদর্শক রুকুনুজ্জামান, সুরুজ আলী ও কনস্টেবল নাছির হোসেনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযানের সময় আাসামিদের নিকট হতে ২০০ লিটার চোলাই মদ জব্দ করা হলেও মামলায় দেখানো হয়েছে মাত্র ৪৮ লিটার। বাকি ১৫২ লিটার মদ পাহাড়পুরের একজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে ওই ব্যবসায়ী মদগুলো সেখানকার একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে বিক্রি করে দেয়। অনুসন্ধানে পাওয়া এসব তথ্যের সবধরনের প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
অনুসন্ধানকালে এ বিষয়ে সরেজমিনে কথা হয় মামলার ১ নং সাক্ষী বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা চন্দ্র কান্ত বৈষ্ণবের সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, চারটি বস্তায় প্রায় দুইশো লিটার মদসহ তিনটি মোটরসাইকেল আটক করে মার্কুলি নৌ—পুলিশ। এরমধ্যে দুইটি মোটরসাইকেল চালিয়ে নৌ—পুলিশ মার্কুলি ফাঁড়ি থানায় নিয়ে যায়। তাছাড়া একটি মোটরসাইকেল নৌকায় তুলে নেওয়া হয়েছে।
মামলার ২য় সাক্ষী হৃদয় বৈষ্ণবও একই কথা জানান। দুজন সাক্ষীর ভাষ্য নিয়ে মামলার আরেক সাক্ষী নৌ—পুলিশের কনস্টেবল নাছির হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনকিছু না জেনেই তার স্যারের নির্দেশে মামলায় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানান।
চোলাই মদের সঠিক পরিমাণ জানতে কথা হয় অভিযোনের সময় পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সাথে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ‘চারটি বস্তায় তাদের দুইশো লিটার মদ ছিল।’
তারা আরও বলেন, চোলাই মদ, তিনটি মোটরসাইকেল ও একজন লোককে ছেড়ে দেবে বলে শুরুতেই তাদের কাছে দুই লক্ষ টাকা দাবি করে আসছিলেন নৌ-পুলিশের পরিদর্শক কাওসার গাজী ও উপপরিদর্শক রুকুনুজ্জামান। এসময় তারা পুলিশকে পয়ষট্টি হাজার টাকা দেওয়ার কথা বললেও তাদের মালামাল ছাড়েননি। পরবর্তীতে দেড় লক্ষ টাকা দাবি করে পুলিশ। তখন তারা আশি হাজার টাকায় রাজি হন। সেটাও কম হওয়ায় তাদের মালামাল ছাড়া হয়নি।
এদিকে, জব্দ তালিকায় না না থাকা তিনটি মোটরসাইকেলের খোঁজে সরেজমিনে গিয়ে মার্কুলি ফাঁড়ি থানায় গিয়ে দেখা যায়নি। সেখানকার স্থানীয়দের সাথে কথা হলে তারা জানান-জব্দ না করায় গাড়িগুলো থানায় রাখা হয়নি। বিশ্বস্ত কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে-গাড়িগুলো মার্কুলি বাজারের কোথাও একটি গুদামে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে মার্কুলি নৌ—পুলিশের ইন্সপেক্টর কাওসার গাজীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ২০০ লিটার মদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পলিথিনে কতখানি ছিল জানি না। মাঝপথে নদীতে এসে মনে হয় একটা পলিথিন ছিড়ে গেছিলো। পরে কতটুকু কি ছিল-না ছিল তা জানি না।’
কয়টা মোটরসাইকেল জব্দ করে কোথায় রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কিসের মোটরসাইকেল। পরে তিনি এ প্রতিবেদককে থানায় গিয়ে চা পানের দাওয়াত দিয়ে বলেন, ‘কিছু জানি এবং সবই বুঝি। থানায় আইসেন।’
এরপর এ বিষয়ে জানতে গত শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) মার্কুলি নৌ-ফাঁড়ি থানায় গেলে মার্কুলি নৌ-ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক কাওসার গাজী বলেন, ‘মিডিয়ায় কথা বলা যাবে না, এটা আইজিপি ও ডিআইজির নির্দেশ।’ এরপর এই প্রতিবেদককে অফিসে রেখেই অফিস ত্যাগ করে চলে যান।
পরে কথা হয় জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী এস আই রুকুনুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোন মোটরসাইকেল জব্দকরিনি। শুধু ৪৮ লিটার চোলাই মদ জব্দ করা হয়েছে বলার সঙ্গে সঙ্গেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’
এ বিষয়ে নৌ-পুলিশের সিলেট রেঞ্জের পুলিশ সুপার ফাল্গুনী পুরকায়স্থ বলেন, ‘আপনি রিপোর্ট করেন বিষয়টি দেখে আমি ব্যবস্থা নেবো।’
সিলেট, সুৃনামগঞ্জ, শাল্লা, মোটরসাইকেল, চোলাই মদ, নৌ-পুলিশ