উজ্জ্বল মেহেদী
‘থ্যাকারের’ থেকে ‘নিঃসঙ্গ টিলা’
রাসেল আহমদ
প্রকাশঃ ২৩ জুলাই, ২০২৬ ৭:১১ অপরাহ্ন
ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি কোনও প্রাকৃতিক নদীভাঙনের গল্প নয়। এটি মূলত আমাদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন নীতি, পরিবেশগত উদাসীনতা এবং স্থানীয় ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদের এক কুৎসিত মেলবন্ধন।
১৯৯১–৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর তীরে খাসজমিতে যে আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন মানুষদের পুনর্বাসিত করেছিল, সাড়ে তিন দশক পর আজ সেই সাজানো বসতিটি মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছিল
তার প্রান্তিক নাগরিকদের বাসস্থান গড়ে দিয়ে মৌলিক অধিকার রক্ষা করেছিল। কিন্তু যাদুকাটা নদীলুটে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগসাজশের 'বালুখেকো' সিন্ডিকেট রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভূমিহীনদের গ্রামটি গিলে ফেলেছে। অবৈধ ড্রেজারের আগ্রাসনে সম্প্রতি ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামে একের পর এক দরিদ্র মানুষের মাথাগোঁজার ঠাঁই- বসতভিটা ও জমি নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া 'কালা বাহিনী'র নির্যাতনের ভয়ে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
ঘাগটিয়া আদর্শগ্রামের গৃহহীন-ভূমিহীনদের এই গল্পটি মূলত আমাদের সামগ্রিক নদী শাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার নীতিগত দেউলিয়াত্বকেই উলঙ্গ করে দেখায়।
যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে তীরবর্তী জনপদে সৃষ্ট সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক। এখানে যে উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি চলছে, তা কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড ডিজাস্টার’ বা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়।
নদীলুণ্ঠনকারী বালুখেকো সিন্ডিকেট কর্তৃক
স্থানীয়ভাবে প্রভাব বলয় তৈরি করা চক্রটি- যাদেরকে সাধারণ মানুষ 'কালা বাহিনী' হিসেবে চেনে- তারা ঘাগটিয়া আদর্শগ্রামের বাসিন্দাদের ভিটাবাড়ি ছেড়ে দিতে ভয়-ভীতি দেখিয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপসৃষ্টি করে। এতে কাজ না হলে- শারীরিক নির্যাতন ও অপকৌশলের মাধ্যমে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলা ও হামলার মাধ্যমে জমির মালিকদের বাধ্য করা হয় তাদের কয়েক দশকের স্মৃতিবিজড়িত ভিটেমাটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে। এরপর দেখা যায় ক্যাপিটালিজমের সবচেয়ে হিংস্র রূপটি। উচ্ছেদকৃত পরিবারের বসতভিটা ও জমি রাতের আঁধারে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে কেটে নেওয়া হয়। এভাবেই প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে সলিল সমাধি ঘটে রাষ্ট্র তার নাগরিককে দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের।
যখন একটি বসতভিটা এভাবে কাটা পড়ে, তখন ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই পাশের বাড়িটি তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে, প্রতিবেশী পরিবারটিও তাদের বসত ঘরটি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় কিংবা 'কালা বাহিনী'র ভয়ে বসতভিটা ও তৎসংলগ্ন জমিটুকু বালুখেকো চক্রের কাছে পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এটি মূলত এক ধরনের ‘চেইন রিয়্যাকশন’, যেখানে একটি জবরদখল পরবর্তী একাধিক জবরদখলকে অবধারিত করে তোলে।
ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, গ্রামটি গিলে খেতে থাকা বালুখেকো সিন্ডিকেট ও কালা বাহিনী'র স্থানীয় নেতৃত্বে রয়েছে বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মোশাহিদ আলম রানু।
তবে অভিযুক্ত রানু মেম্বার ও বালু মহালের প্রভাবশালী ইজারাদারেরা যখন দাবি করেন যে, নদীভাঙনের অবধারিত ক্ষতি থেকে বাঁচতে মানুষ 'স্বেচ্ছায়' তাদের বসতবাড়ি ও তৎসংলগ্ন জমা-জমি বিক্রি করছে, তখন তা যে মূলত এই জবরদখল ও বেআইনি লুণ্ঠনকে বৈধতা দেওয়ার একটি ধূর্ত অপকৌশল মাত্র, এটি বুঝতে বাকী থাকেনা।
এই তথাকথিত 'স্বেচ্ছা বিক্রির' নেপথ্যে যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ক্রিয়তা কাজ করেছে, তাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের একজন ষাটোর্ধ পুনর্বাসিত নাগরিক যখন নিজের শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচাতে গিয়ে উল্টো বালুখেকো চক্রের মামলায় কারাবরণ করেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে স্থানীয়ভাবে আইনের শাসন এবং বিচারব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর।
যাদুকাটা নদী ও ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের ঘটনা শুধুমাত্র স্বার্থের লুণ্ঠন নয়, এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরকার বিশেষ দূর্বলতাকে নির্দেশ করে, যেখানে সাধারণ নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার চেয়ে অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের মুনাফাই অগ্রাধিকার পায়।
এই সংকটের অর্থনৈতিক বিস্তার কেবল স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক অভিযোগে দেখা গেছে, যাদুকাটা বালুমহালকে কেন্দ্র করে সরকারের রাজস্ব অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার জাতীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অথচ এই বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বা টেকসই প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখতে পাননি স্থানীয় লোকজন।
বালুমহাল ইজারার নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কোনো বালু উত্তোলন করা যাবে না এবং নদীর তীর কাটা যাবে না। কিন্তু যাদুকাটায় ইজারাদারেরা নিজেদের মুনাফা সর্বোচ্চ করতে আইনের এই মৌলিক ধারাগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাতের আঁধারে ড্রেজার চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ইজারাদাররা নিজেরা বালু উত্তোলন না করে বিভিন্ন উপ-গ্রুপকে টোল আদায়ের লাইসেন্স দিয়ে দিচ্ছেন, যা প্রকারান্তরে নদীর দুই তীরে এক বিশাল অনিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিহীন লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে।
যাদুকাটা তীরের এই মানবিক বিপর্যয় কেবল ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি লাউড়েরগড়, ডালারপাড়, রাজারগাঁওসহ অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামকে আজ অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। এমনকি দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন ঐতিহ্য ‘শিমুল বাগান’-এর সীমানাও আজ এই রাক্ষুসে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্র ঝুঁকিতে। প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে পরিচিত নদী তীরের সুবিশাল বাঁশঝাড়টি হারিয়ে গেছে, তা এই অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করবে।
পরিবেশ, মানবাধিকার ও স্থানীয় অর্থনীতি- এই তিনটির ওপর যাদুকাটার সংকট যে মরণকামড় বসিয়েছে, তার স্থায়ী সমাধান শুধু সাময়িক ভ্রাম্যমাণ আদালত বা টাস্কফোর্সের অভিযানের মাধ্যমে মিলবে না।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন নদী শাসনের মৌলিক দর্শনে পরিবর্তন আনয়ন। এজন্য যাদুকাটা নদী ও তার সংলগ্ন সংবেদনশীল তীরবর্তী অঞ্চলকে অবিলম্বে 'পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা'(ECA) ঘোষণা করা জরুরি। যে কোনও মূল্যে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ড্রেজার বা ভারী যন্ত্রের ব্যবহার স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে, স্থানীয় সনাতন বারকি শ্রমিকদের অংশগ্রহণে পরিবেশসম্মত বালু উত্তোলনের আইনি ও সমবায়ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে যেমন নদী রক্ষা পাবে, তেমনি নদীকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা হাজারো প্রান্তিক মানুষের জীবিকার অধিকারও সুরক্ষিত হবে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কর্তৃক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাদুকাটা নদীতে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা কোস্টগার্ড মোতায়েনের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য। একই সঙ্গে, ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন প্রকল্পের বাসিন্দা যারা আজ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তাদের বলপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নদী ও তার অববাহিকা কেবল বালু আর পাথরের খনি নয়; এটি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম, যার সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের বসতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। রাষ্ট্র যদি তার নিজের গড়া আদর্শ গ্রামের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তা সমগ্র পুনর্বাসন নীতির ওপরই এক বড় চপেটাঘাত।
তবে শেষ কথা হলো, যাদুকাটা নদীলুট ও তীরবর্তী জনপদের কান্না থামানো এবং চলমান দস্যুতার অবসান ঘটানো এখন আর কোনো স্থানীয় প্রশাসনের 'রুটিন ওয়ার্ক' নয়-এটি দেশের নদী, পরিবেশ এবং প্রান্তিক মানুষের নাগরিক অধিকার রক্ষার এক জরুরি জাতীয় পরীক্ষা।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]