হবিগঞ্জে দেড় মাসের ব্যবধানে একই বাঁধে ফের ভাঙন, প্লাবিত ২২ গ্রাম
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ২:৫২ অপরাহ্ন
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায় আবারও ভেঙে গেছে খোয়াই নদীর বাঁধ। যে বাঁধটি দেড় মাস ধরে মেরামত হচ্ছিল, রোববার সকালে সেটির একই অংশ পানির স্রোতে ধসে যায়। দুপুরের মধ্যেই নদীর পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে।
একবার পানিতে ডুবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন এলাকার মানুষ। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু আর মাছের খামারের আগের ক্ষতি তখনো অনেকের জীবনে পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই একই জায়গায় আবার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় তাদের সামনে এখন নতুন করে অনিশ্চয়তা।
সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, বাঁধ ভেঙে কালীগঞ্জসহ আশপাশের অন্তত ২২টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জের বাসিন্দা মহিদুর রহমানের কণ্ঠে যেন দেড় মাস আগের সেই ভয় ফিরে এসেছে। তিনি জানান, একই জায়গায় আবার বাঁধ ভাঙার ঘটনা এলাকার মানুষের জন্য নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
মহিদুর বলেন, ‘দেড় মাস আগে একই জায়গায় বাঁধ ভেঙে আমরা পানিবন্দি হয়েছিলাম। সেই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার একই জায়গা ভেঙেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, শনিবার রাত থেকেই পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। রোববার সকালে পানির চাপ বাড়তে বাড়তে মেরামতাধীন বাঁধের অংশটি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে সেটি ভেঙে নদীর পানি ঢুকে পড়ে গ্রামগুলোর দিকে।
পানির স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ গবাদিপশু নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। আবার অনেক পরিবার নিজেরাই বুঝতে পারছে না, পানি আর কতটা বাড়বে।
সাদেক ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, আগেরবার বাঁধ ভেঙে তাদের ফসল, ঘরবাড়ি ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছিল। এবারও নদীর পানি বাড়তে থাকায় পরিবার নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন।
এই বাঁধটি নতুন করে ভাঙার ঘটনা স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও বাড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, আগের ভাঙনের পর বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হলেও দেড় মাসেও তা শেষ হয়নি। কাজের ধীরগতি ও অনিয়মের কারণেই বাঁধটি আবার দুর্বল অবস্থায় ছিল বলে তারা মনে করছেন।
খোয়াই নদীর ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও বাঁধের মেরামতকাজ যথাযথভাবে শেষ করা যায়নি। তিনি জানান, কাজটি আরও সতর্কতার সঙ্গে করা হলে এবার এত মানুষকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে হতো না।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর উদ্দিনের অভিযোগ, বর্ষার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ শেষ করার জন্য তারা বারবার কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বলেন, এখন একই জায়গা আবার ভেঙে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিতে পড়েছেন।
গত ৯ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকার খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। তখন ঘরবাড়ির পাশাপাশি ফসল, গবাদিপশু ও মাছের খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে , ওই ঘটনায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সেই ক্ষতি সামলে ওঠার আগেই এবার আবার পানি ঢুকেছে দক্ষিণ চরহামুয়া, উত্তর চরহামুয়া, কালীগঞ্জ, সুগার, আদ্যাপাশা, নোয়াবাদ, হাতিরথান, কাটিয়াদি, বৈদ্যের বাজার, বাঙ্গাঁও ও দক্ষিণ বাঙ্গাঁওসহ আশপাশের এলাকায়।
ফলে আগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকের কাছে এবারের পানি শুধু নতুন দুর্ভোগ নয়; পুরোনো ভয় ও ক্ষতিরও পুনরাবৃত্তি।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, উজান থেকে পানি আসায় সোমবার খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার প্রায় ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, শনিবার থেকেই উজানের পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। পানির উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট হওয়ায় মেরামতাধীন বাঁধটি পানির চাপ সামলাতে পারেনি। রোববার দুপুরের দিকে বাঁধটি ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের ভাঙনের পর থেকেই নাসিরপুর এলাকায় বাঁধ মেরামতের কাজ চলছিল।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আবু জাহের বলেন, নতুন করে ২২টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পরিবার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আক্রান্ত মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে।
তবে উজান থেকে পানি আসা অব্যাহত থাকায় নদীর পানি আরও বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জে বাঁধ ভাঙন, কালীগঞ্জে বন্যা, খোয়াই নদীর পানি, হবিগঞ্জে পানিবন্দি পরিবার, কালীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি, খোয়াই নদীর বাঁধ, হবিগঞ্জের বন্যার খবর, কালীগঞ্জে নদীর পানি বৃদ্ধি