২৪ জুলাই ২০২৬

প্রবাস

‘বড় একটা ঢেউ এসে তাদের নিয়ে গেল’: সৈকতে মা-মেয়ের মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৪ জুলাই, ২০২৬ ২:৪৮ অপরাহ্ন


যুক্তরাজ্যের এসেক্স উপকূলে সমুদ্রস্নানে নেমে সাত বছরের একটি শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছেন বাংলাদেশী সিলেটি বংশোদ্ভূত ও যুক্তরাজ্য যুবদল নেতা ডা. মনসুর রহমানের স্ত্রী শ্যালি রহমান (৪২) ও তাঁর মেয়ে সামিহা রহমান (১৫)। বুধবার (২২ জুলাই) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় কলচেস্টারের কাছে ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। 

যে শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁরা প্রাণ হারান, সে এখনো হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় জড়িত আরও তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িত সবাই একে অপরের পরিচিত।

শ্যালি রহমানের ভাশুর মতিউর রহমান জানান, পরিবারটি সমুদ্র সৈকতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল, তখনই ‘বড় একটা ঢেউ এসে তাদের নিয়ে যায়’। ব্র্যাডফোর্ডে দীর্ঘদিন বসবাসকারী মতিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার এখন কার্যত বাকরুদ্ধ। আমরা প্রচণ্ড রকম বিধ্বস্ত, কী ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করার মতো ভাষাও যেন আমাদের নেই। তিনি তাঁর ভাইঝি সামিহাকে অত্যন্ত ভালো মানুষ এবং শ্যালিকে সবসময় অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসা একজন মানুষ বলেও বর্ণনা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন অনেকেই। এর মধ্যে ছিলেন কাছের সিভিউ বিচ ডাইনার নামের একটি খাবারের দোকানে কর্মরত কয়েকজন কিশোর-কিশোরী এবং কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া কর্মরত অবস্থার বাইরে থাকা এক প্যারামেডিকও।

এসেক্স পুলিশ জানায়, বুধবার (স্থানীয় সময়) সন্ধ্যা ৫টা ৩৫ মিনিটে  অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে সিভিউ অ্যাভিনিউর কাছে সমুদ্রে দুর্ঘটনার খবর পায় তারা। নিহতরা লন্ডনের বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিটেক্টিভ চিফ ইন্সপেক্টর আল পিচার বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের ধারণা, তাঁরা সাত বছর বয়সী একটি ছেলেশিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, যে তখন পানিতে বিপদে পড়েছিল। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে ইতিমধ্যে ডজনখানেক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ, এবং এ বিষয়ে কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

ইস্ট অব ইংল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও নিহত দুজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া মোট চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, যাদের একজনকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয়।

সৈকতের কাছে ফুল দিতে আসা বাসিন্দা রিটা কুম্বস (৭০) ঘটনাটিকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে ফেরার পর এক ব্যক্তি এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন যে কথাই বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, জরুরি সেবাকর্মীদের যতই প্রশংসা করি না কেন, তা কম হবে। তাঁরা অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করেছেন। এটা সত্যিই মর্মান্তিক।

স্থানীয় কনজারভেটিভ কাউন্সিলর কার্ল পাওলিং জানান, উপকূলরক্ষী বাহিনী ও আরএনএলআই দল খুবই দ্রুত ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাঁর ১৯ বছর বয়সী মেয়ে লিওনি পাওলিং, যিনি কাছের একটি ক্যাফেতে কাজ করেন, উদ্ধারকাজে সহায়তাকারী তরুণদের একজন ছিলেন। তিনি পরিবারটির কাছে পৌঁছাতে একটি প্যাডলবোর্ড খুঁজেছিলেন এবং পরে দেখেছিলেন উদ্ধারকর্মীরা কীভাবে সিপিআর দিয়ে তাঁদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু পারা যায় তার সবটুকুই করার চেষ্টা করেছি।

কার্ল পাওলিং আরও জানান, ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে জোয়ারের উচ্চতম সময় ছিল, যখন স্রোত প্রায়ই মানুষকে গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, এলাকাটির সঙ্গে পরিচিত না থাকলে এটি বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

সেন্ট পিটার অ্যান্ড সেন্ট পলস চার্চের যাজক রেভারেন্ড জো প্যারট বুধবার সন্ধ্যা ও বৃহস্পতিবার গির্জা খুলে দেন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও শোকাহতরা প্রার্থনা ও সান্ত্বনার জায়গা পান। তাঁর স্বামী নিজেও আরএনএলআই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ঘটনাস্থলে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যাঁদের আমরা হারিয়েছি এবং তাঁদের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য আমাদের হৃদয় ভেঙে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হ্যারিয়েট হোয়াইটসাইড তাঁর ছেলেকে নিয়ে বাগানের ফুল সৈকতে রেখে আসেন। ৩৬ বছর বয়সী এই নারী বলেন, সবাই খুবই মর্মাহত।

সৈকতসংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা ক্লেয়ার ডগলাস জানান, বুধবার ঘটনাস্থল থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ সরে যাননি, যতক্ষণ না নিজেদের সাধ্যমতো সবকিছু করা হয়েছে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, এটা সত্যিই হৃদয়বিদারক। আতঙ্কের মধ্যে মনে হয়, শারীরিকভাবে করার মতো কিছুই নেই, শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া।

ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এসেক্সের হার্লো সফরকালে এই মৃত্যুকে ‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক’ বলে মন্তব্য করেন এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া জরুরি সেবা দলগুলোকে ধন্যবাদ জানান।


শেয়ার করুনঃ

প্রবাস থেকে আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্য, মৃত্যু, বিএনপি, মা ও মেয়ে,

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ