দূষণে দমবন্ধ সুতাং: নদীজুড়ে বিষ, ঝুঁকিতে মানুষ ও খাদ্যশস্য
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন
মধ্যনগর উপজেলা সদর ইউনিয়নের গলই খালী গ্রামের উত্তর পাশে থাকা গুমাই নদীতে অবৈধভাবে দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে দিনে-রাতে অবাধে বালু উত্তোলন কার্যক্রম চলে আসছে। নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের মধ্যনগর উপজেলার শাখার আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভীর নেতৃত্বে এই কার্যক্রম চলে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে রহস্যজনক কারণে উপজেলা প্রশাসন এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় উপজেলা বিএনপি-অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও স্থানীয় মানুষজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের গলইখালী গ্রামের উত্তরপাশে গুমাই নদীটির একটি অংশের অবস্থান। নদীটির পাড় এলাকাটি বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে যায়। এখানে দুই একর সরকারি খাস জায়গা রয়েছে। এই স্থানটিকে উঁচু করার জন্য এটির সংলগ্ন গুমাই নদীতে দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে লোকজন নিয়োজিত করে ওই নদী থেকে বালি উত্তোলন করে স্থানটিকে গত দেড়মাসেরও বেশি সময় ধরে ভরাট করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের দুগনই গ্রামের বাসিন্দা মধ্যনগর উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মধ্যনগরে গুমাই নদের যে স্থানটি থেকে বালু উত্তোলন করছে তা উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় শুনেছি। রহস্যজনক কারণে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। নানা অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
উপজেলার মধ্যনগর সদর ইউনিয়নের গলইখালী, পিঁপড়াকান্দা ও তেলিপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বালু ভরাট করার স্থানটি সরকারি খাস জায়গা। এখানে শুকনো মৌসুমে আমাদের তিন গ্রামের কৃষকেরা গরু চড়াতাম। বালু তোলার পাশপাশি নদীর পাড়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। অবাধে বালু উত্তোলন করায় নদের পাড়টি ভেঙে যাচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াশীল আহমেদ বলেন, মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও সঞ্জয় ঘোষ স্যারকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একাধিকবার জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সুদৃষ্টি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল হোসেন বলেন, গুমাই নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি কী ভাবে কী হচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারছি না। অবৈধভাবে গুমাই নদে দুটি ড্রেজার বসিয়ে চলে আসা বালু উত্তোলন কাজটি দ্রুত বন্ধ করা উচিত।
মধ্যনগর সদর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার বলেন, গলইখালী গ্রামের উত্তরপাশের গুমাই নদ সংলগ্ন এলাকায় এক একর খাস জমি উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের দুগনই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আউয়াল তালুকদার বন্দোবস্ত নিয়ে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে এটির নামজারি করিয়েছেন। বন্দোবস্তের দখলও তিনি বুঝে নেননি। শ্রেণি পরিবর্তন করার বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়নি। গেল রমজান মাসে আমাদের তৎকালীন ইউএনও উজ্জ্বল রায় স্যারের নির্দেশে সেখানে গিয়ে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কাজটি আমি দুইদিন বন্ধ করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভী বলেন, এখানে আমাদের রেকর্ডীয় দুই একর জায়গা রয়েছে। আমরা গুমাই নদে কোনো ড্রেজার বসাইনি। সরকারি জায়গা বন্দোবস্ত নেওয়ার তথ্যটিও সঠিক নয়। আমরা তাহিরপুর উপজেলা থেকে বালু ও মাটি কিনে এনে জায়গাটি ভরাট করছি। আমাকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এখানে জনগণকে কম দামে গ্যাস ও সার দেওয়ার একটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। পাশে গরুর খামারও করা হবে।
ধর্মপাশা উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও সঞ্জয় ঘোষ বলেন, এ উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে কিছুদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার কাছে কেউ এ নিয়ে অভিযোগ না করলেও ঘটনাটি আমার নজরে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।
মধ্যনগর, ড্রেজার, বালু উত্তোলন, প্রশাসন