২৬ মে ২০২৬

অভিবাসন

মানবপাচার করেই রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ তারা

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ৩১ মার্চ, ২০২৬ ৯:৫৬ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র আবারও সামনে এসেছে। উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে একের পর এক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাঠানো হচ্ছে, আর এই সুযোগে দালালচক্র রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠছে। বিপরীতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার, হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জন।

জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁও গ্রামের ২৩ বছর বয়সী শায়েক আহমদ ছিলেন এমনই এক স্বপ্নবাজ তরুণ। পরিবার তাঁর ইউরোপ যাত্রার জন্য দুই দফায় দালালদের প্রায় ১২ লাখ টাকা দেয়। এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তাঁর বাবা আখলুছ মিয়াকে গোয়ালের গরু বিক্রি করতে হয়েছে, এমনকি হাওরের জমিও ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে শায়েককে।

শায়েকের পরিবারের মতো একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন আরও অনেকে। অভিযোগ উঠেছে, আজিজুল ইসলাম নামের এক দালাল তাঁদের লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে গ্রিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর মাধ্যমেই জগন্নাথপুর উপজেলার আরও কয়েকজন তরুণ এই পথে যাত্রা করেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই আর দেশে ফিরতে পারেননি।
গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ৩৮ জন যাত্রী নিয়ে একটি রাবারের বোট গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু মাঝপথে দিক হারিয়ে ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে বোটটি। খাবার ও পানির সংকটে একে একে মারা যান অন্তত ১৮ জন। দুই দিন লাশগুলো বোটে পড়ে থাকার পর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার একাধিক তরুণ প্রাণ হারান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তারা যুবকদের ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখায় এবং দ্রুত টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে পরিবারকে চাপের মুখে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে তরুণরাই পরিবারকে রাজি করাতে বাধ্য করে। এরপর শুরু হয় টাকা জোগাড়ের সংগ্রাম—কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ঋণ নেয়, কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে।

এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে স্থানীয়রা আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেনপরাগাঁও গ্রামের শাহিন মিয়া, বালিকান্দির এনাম আহমদ ও ছিলাউরা গ্রামের করিম মিয়া। দিরাই উপজেলার ক্ষেত্রে জসিম উদ্দিন নামের এক দালালের কথাও উঠে এসেছে, যার বিরুদ্ধে আগেও মানব পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
একজনকে ইউরোপে পাঠাতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সাধারণত অর্ধেক টাকা আগে এবং বাকি টাকা যাত্রার আগে পরিশোধ করতে হয়। এই বিপুল অর্থের লেনদেনই দালালদের দ্রুত সম্পদশালী করে তুলছে।

দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, মুজিবুর রহমান নামের এক দালাল অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাসের দালালির মধ্যেই তিনি লাখপতি থেকে প্রায় কোটিপতি হয়ে গেছেন। এলাকায় তিনি দালানবাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং জমিজমা কিনেছেন।
একইভাবে ইতালিপ্রবাসী সালেহ আহমেদও দালালির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজেও অবৈধভাবে ইউরোপে গিয়ে এখন একই পথে অন্যদের পাঠাচ্ছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তিনি প্রতিজনের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন।

নিহতদের পরিবারগুলোর মধ্যে এখন শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারাপাশা গ্রামের এক বাবা বলেন, দালালরা নিরাপদ যাত্রার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তাঁদের সন্তানদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তবে কেউ কেউ নিজেদের দায়ও স্বীকার করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, আমরাই তো দালালদের কাছে যাই। তারা প্রলোভন দেখায়, আর আমরা বিশ্বাস করি।


ঘটনার পর প্রশাসন কিছুটা সক্রিয় হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে দালালদের একটি তালিকা তৈরি করছে এবং জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখ্য করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, এ ঘটনায় দুটি মামলা রুজ হয়েছে। দিরাই থানায় একটি এবং জগন্নাথপুর থানায় একটি মামলা রুজু হয়েছে। এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত আছে তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করতেছি। পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে এবং তাদের দ্রুতই আমরা গ্রেপ্তার করতে পারব।

তিনি আরও বলেন, একটি কথা বলে রাখি এখানে অধিকাংশ লোকই দেশের বাহিরে থাকে এবং সেখান থেকেই মানবপাচারের কাজটি করে। এখন তারা যে পর্যায়ে লোকই থাকুক না কেন তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো আর ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোন ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।


শেয়ার করুনঃ

অভিবাসন থেকে আরো পড়ুন

মানবপাচার, আঙুল ফুলে কলাগাছ, সিলেট, আদম ব্যবসা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ