১১ আগস্ট ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

দুই সপ্তাহের অনুমতি নিয়ে মাসব্যাপী মেলার চেষ্টা, বিয়ানীবাজারের রথমেলা ঘিরে নানা অভিযোগ

শহিদুল ইসলাম সাজু, বিয়ানীবাজার, সিলেট

প্রকাশঃ ১১ আগস্ট, ২০২৬ ৫:১৮ অপরাহ্ন


সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুপাতলাস্থ শ্রীশ্রী বাসুদেব মন্দিরের রথযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত রথমেলা ঘিরে জেলা প্রশাসনের দেওয়া অনুমতিপত্রের একের পর এক শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও গভীর রাত পর্যন্ত মেলা চালু রাখা, সড়ক দখল করে স্টল বসানো, পার্কিং ব্যবস্থার অভাব, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা এবং ধর্মীয় আয়োজনকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়াসহ নানা অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এত অভিযোগের পরও প্রশাসনের কার্যকর তদারকি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে তাদের ভূমিকা নিয়েও।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২০ জুলাই সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাধারণ শাখা থেকে মন্দিরের সীমানার মধ্যে রথমেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতিপত্র অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে মেলার কার্যক্রম শেষ করার কথা এবং প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে মেলা বন্ধ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে রাত ১২টা পর্যন্ত মেলা চালু রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে রাত যত গভীর হচ্ছে, আশপাশের এলাকায় শব্দদূষণ, যানজট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ততই বাড়ছে।


অনুমতিপত্রে আরও নির্দেশনা ছিল— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, আয়োজকদের নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে আনসার-ভিডিপি নিয়োগ, মন্দির ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি না করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, মেলা কোনোভাবেই বাণিজ্যিক পরিসরে আয়োজন করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন— স্থানীয়দের অভিযোগ, রথযাত্রার ধর্মীয় ঐতিহ্যের বদলে মেলার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে বাণিজ্যিক স্টল। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের আয়োজক কর্তৃপক্ষ একমাসব্যাপী মেলার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রশাসনের অনুমতি ছিল মাত্র দুই সপ্তাহের— যা নিয়ে রথমেলার মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।


ব্যবসায়ীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় মেলার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা সজীব ভট্টাচার্য, অরুণাভ পাল চৌধুরী মোহন, সাবেক উপজেলা যুবলীগ নেতা অজিত চক্রবর্তী, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মিঠুন পাল চৌধুরী ও সাবেক যুবলীগ নেতা প্রতুল চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে সজীব ভট্টাচার্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত যুবদল নেতা তারেক হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বলে জানা গেছে।


মেলার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের সড়কেও। অনুমতিপত্রে প্রধান সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে আয়োজকদের নিজস্ব ব্যবস্থা নেওয়া ও পর্যাপ্ত পার্কিং জোন তৈরির নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ। সড়কের পাশেই বসানো হয়েছে স্টল, আর দর্শনার্থীদের গাড়ি-মোটরসাইকেল রাখার জন্য নেই কার্যকর কোনো পার্কিং ব্যবস্থা। গত শুক্রবার বিকেলে সিলেট-বারইগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের মেলা এলাকার উভয় পাশে দেড় কিলোমিটারজুড়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। রাত ৮টার দিকে বিয়ানীবাজার থানার ওসি আবু জাফর সরেজমিনে গিয়ে হস্তক্ষেপ করলে রাত ১০টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।


মেলায় আসা নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিনই মেলা প্রাঙ্গণে উত্ত্যক্ত করা, হয়রানি ও মারামারির মতো ঘটনা ঘটছে, বিশেষত সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে বলে জানান তারা।


বিদ্যুৎ সাশ্রয় সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুমতিপত্রে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে জারি করা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় জেনারেটর রাখার কথা বলা থাকলেও মেলার আলোকসজ্জা ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে দাবি স্থানীয়দের।


মেলাকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে এলাকায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী মেলা এলাকায় সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজারে নিহত তিন যুবকের হত্যা মামলার কয়েকজন আসামিকেও মেলা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ‘রথমেলা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আয়োজন করা হলেও শ্রী শ্রী বাসুদেব মন্দিরের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিকৃত করে সেটিকে বানিজ্যিক পরিসরে রূপ দেয়া হয়েছে। মেলায় প্রায় প্রতিদিন মারামারির ঘটনা ও হয়রানির অভিযোগ উঠছে। তাছাড়া এই মেলাকে ঘিরে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। অনেককেই গোপনে মিটিং করতে দেখেছেন বলে লোকমুখে শুনেছি। যার কারণে সম্প্রতি বিয়ানীবাজার পৌরশহরে ছাত্রলীগের একটি মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা স্থানীয় এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।’


এ বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চখণ্ড বাসুদেব সেবক সংঘের সভাপতি অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘মেলা তো মেলাই সেটা ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেই হোক অথবা বানিজ্যিক পরিসরেই হোক। আমরা প্রশাসনের সকল নিয়মকানুন মেনেই মেলা পরিচালনা করছি।’ অনুমতিপত্রে বাণিজ্যিক পরিসরে মেলা আয়োজন নিষেধ এবং রাত ৯টার পর কার্যক্রম বন্ধ রাখার শর্তের কথা তুলে ধরা হলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে বলেন, ‘রথমেলা একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আমাদের বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা। এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই।’


মেলায় নিয়মিত মারামারির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মারামারির কোন ঘটনা আমাদের চোখে পড়েনি। এগুলো অপপ্রচার।’ মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা মেলার মেয়াদ দুই সপ্তাহ থেকে মাসব্যাপী বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিকট আমরা আবেদনপত্র জমা দিয়েছি।’


বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘ইতোমধ্যে অভিযোগের ভিত্তিতে রথমেলায় অভিযান চালিয়ে সড়কের পাশের স্টল ও পার্কিং বন্ধ করা হয়েছে। তাছাড়া মেলা বানিজ্যিক পরিসরে করা কিংবা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সরকারি বিধি অমান্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ তবে মেয়াদ বাড়ানোর এখতিয়ার তার নেই বলে জানান তিনি, ‘মেলার পারমিশন থেকে শুরু করে সময় বাড়ানোর এখতিয়ার আমার নেই। এসব বিষয় জেলা প্রশাসক মহোদয় দেখার সুযোগ রয়েছে।’


সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনোভাবেই মেলার মেয়াদ দুই সপ্তাহের বেশি বাড়ানো হবে না। তিনি বলেন, ‘অনুমতিপত্রে দেয়া শর্তাবলী ভঙ্গের বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমি ইউএনও বিয়ানীবাজারকে নির্দেশনা প্রদান করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনভাবেই রাত ৯টার পর মেলা চালু রাখা যাবে না। পাশাপাশি মেলায় ধর্মীয় বিষয় ব্যতিরেকে বানিজ্যিক স্টল বসানো থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষে সরকার কর্তৃক আরোপিত বিধিনিষেধ অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এসব শর্তাবলী ভঙ্গ করলেই আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

রথমেলা, বিয়ানীবাজার, সিলেট জেলা প্রশাসন, শর্ত ভঙ্গ, বাণিজ্যিকীকরণ, অভিযোগ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ