ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকা অবস্থায় সিলেট বিভাগের ১১ জনকে উদ্ধার
অভিবাসন
প্রকাশঃ ১১ আগস্ট, ২০২৬ ৫:৪২ অপরাহ্ন
লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে দিকভ্রান্ত হয়ে ভাসতে থাকা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ১৫ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১১ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দাই সবচেয়ে বেশি। মিশরীয় নাগরিকসহ মোট ৪৭ জনকে গত মাসে উদ্ধার করে ডেনমার্কের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ, পরে যাদের হস্তান্তর করা হয় মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে।
জানা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এই বাংলাদেশিরা পৃথকভাবে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে অবস্থানকালে কেউ কেউ ইউরোপে অনিয়মিত পথে প্রবেশের উদ্দেশ্যে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, আবার কেউ কেউ লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের মাধ্যমেই সমুদ্রপথে ইউরোপযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। পাচারকারীদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে জনপ্রতি ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন তারা এই অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ দেশে থাকা জমিজমাও বিক্রি করেছেন।
গত ১০ জুলাই দিবাগত রাতে মিশরীয় নাগরিকসহ মোট ৪৭ জন একটি রাবারের নৌকায় করে লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেন। স্পিডবোটের ইঞ্জিনচালিত এই নৌকায় কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীদের বলা হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে সময় লাগবে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা।
কিন্তু দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা না থাকায় নৌকাটি প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে সাগরে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকে। এক পর্যায়ে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে নৌকাটি একেবারে অচল হয়ে সাগরে ভাসতে শুরু করে। এরপর প্রায় দুই দিন তিন রাত পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছাড়াই সাগরে কাটাতে হয় আরোহীদের। রাতে দূরে কোনো জাহাজের আলো দেখলেই মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সাহায্যের সংকেত পাঠানোর চেষ্টা করেন তারা। একপর্যায়ে ডেনমার্কের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মায়েরস্ক’ তাদের উদ্ধার করে মিশরীয় নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। নৌবাহিনী তাদের নিয়ে যায় পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে ও প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন পোর্ট সাঈদে গিয়ে সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে হেফাজতে থাকা বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা এবং দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। পরে দূতাবাসের কর্মকর্তারা সরাসরি সাক্ষাৎ করে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বিস্তারিত শোনেন।
দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সাগরে থাকার কারণে অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ হলেও এখন দ্রুত দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তারা।
পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে হেফাজতে থাকা ১৫ বাংলাদেশির মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার রয়েছেন পাঁচজন মো. সাজুর আহমেদ, সুলেমান মিয়া, মো. সেলিম হোসেন, মো. মেহেদী হাসান ও মো. মাসুম মিয়া। হবিগঞ্জ জেলার রয়েছেন পাঁচজন মো. সবুজ আহমেদ, মো. সারওয়ার হোসেন, জয় শেখ, আব্দুল আওয়াল চৌধুরী ও মো. শিহাব উদ্দিন। এ ছাড়া সিলেট জেলার জয়নাল উদ্দিনও রয়েছেন হেফাজতে থাকাদের মধ্যে। বাকিরা মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা।
দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, মিশরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাদের বৈধ পাসপোর্ট নেই, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রাভেল পারমিট (টিপি) ইস্যুর ব্যবস্থাও করেছে দূতাবাস।
ভূমধ্যসাগর, লিবিয়া, ইউরোপ, বাংলাদেশি, মানবপাচারকারী চক্র, মিশরীয় নৌবাহিনী