তীব্র তাপদাহের সঙ্গে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, নাকাল সিলেটবাসী
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩৪ অপরাহ্ন
৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পুড়ছে সিলেট। এর মধ্যে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবনে নেমে এসেছে বাড়তি ভোগান্তি। দিনে-রাতে সমানতালে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ করছেন নগরবাসী। কোথাও কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকারও অভিযোগ গ্রাহকদের।
এ অবস্থায় তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সিলেট নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা।
এদিকে ঘণ্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম। এতে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবিরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকট থাকায় জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। সিলেটে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছো তা যথাযথভাবে বণ্টন করা হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও পুনরায় কমে আসবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সর্বশেষ রাত ৮টা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে পিডিবির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৬৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ২১৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছে। ঘাটতি ছিল ৫০ মেগাওয়াট।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, ‘যেহেতু বিদ্যুতের ঘাটতি আছে, ফ্রিকোয়েন্সি মেইনটেন করতে হচ্ছে। ফ্রিকোয়েন্সি মেইনটেন করা না হলে পাওয়ার প্লান্ট পড়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘চলমান সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে, আমরাও চেষ্টা করছি। এটা জ্বালানির সংকট, ন্যাশনাল ক্রাইসিস। এখন এটার সমাধান তো সব বিষয়ে তো আর আমি বলতে পারবো না।’
এদিকে মঙ্গলবার সিলেটে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। এ দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের অস্বস্তি আরও তীব্র হয়েছে।
এ অবস্থায় তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা বিরাজ করছে নগরবাসীর মধ্যে। তারা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে দিন-রাত সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার কোথাও বিদ্যুৎ যাওয়ার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তারা।
তবে গরমের এই অস্বস্তির মধ্যে স্বস্তির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আগামী ২৪ ঘন্টায় সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সময়ে কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাড় কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জাহিদ বলেন, ‘প্রায় তিন ঘণ্টা যাবৎ বিদ্যুৎ নেই। অসহনীয় গরমে অবস্থা নাজেহাল। এভাবে চলতে থাকলে অবস্থার আরও অবনতি হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের এমন ভেলকিবাজিতে বাসায় থাকতে অনেক কষ্ট হয়। সংশ্লিট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা উচিত। নয়তো জীবন চালনা আরও কষ্টের হয়ে যাবে।’
একই এলাকার বাসিন্দা কয়েস আহমদ বলেন, ‘একঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো কখনো একঘণ্টা পরপর দুইঘণ্টা করেও বিদ্যুৎ থাকছে না। দিন ও রাত সমানতালে লোডশেডিংয়ের কারণে অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।’
চাকুরিজীবি হেলাল উদ্দিন বলেন, অদিফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৩ ঘণ্টাও কারেন্ট (বিদ্যুৎ) থাকে না। কাজ করতে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে কোনো কাজই সঠিক সময়ে শেষ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া কয়েকদিন থাকি অনেক গরম। কারেন্ট না থাকলে কিলা অফিস করতাম।’
অন্যদিকে, সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই সংকট অবশ্য নতুন নয়। গত এক বছর ধরেই বিভিন্ন সময়ে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং হয়ে আসছে। চলতি বছরের জুনে সিলেট অঞ্চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৩২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৪৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ তখন ঘাটতি ছিল ৮৪ মেগাওয়াট।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমানোর জন্য পিডিবির কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। তার মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নগরীর বিভিন্ন নাগরিক সেবা নির্ভরশীল। তাই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে নাগরিক সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, ‘সুরক্ষার জন্য উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এটা মেনটেইন করতে হবে। লোডশেডিং তো কারো কাম্য না, আমারও কাম্য না, আপনারও কাম্য না বা কারোই কাম্য না। আমাদের সিস্টেম সুরক্ষার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার শেডিংটা, মানে ফ্রিকোয়েন্সি মেনটেন করার জন্য এটা করার প্রয়োজন হয় আর কি। এনএলডি আমাকে যেটা বরাদ্দ দেয়, সেটা আমি ডিস্ট্রিবিউট করি।’
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানিয়ে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। তারা দেখতেছেন, কী করা যায়।’
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ইমাম হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তা শঙ্কা তো আছেই। মানুষজন আসছে, ওনাদের মত করছেন। আমরা তো আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করতেছি। যতটুকু বিদ্যুৎ পাই, সেটাকে আমরা ডিস্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করি, কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। এর বাইরে তো আমাদের আসলে কিছু করার নাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট থানায় এ বিষয়গুলো জানানো হয়েছে।’
তীব্র তাপদাহ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জনভোগান্তি, শিশু, বয়স্ক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান