ভূমধ্যসাগরে নৌযান ডুবে ৭০ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ, উদ্ধার বাংলাদেশিসহ ৩২
অভিবাসন
প্রকাশঃ ৮ মার্চ, ২০২৬ ৭:২০ অপরাহ্ন
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন সিলেট বিভাগের দুই নারী। পরিবারের অভাব ঘোচানো এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তারা গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও মানসিক আঘাত নিয়ে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জের হোসনে আরা (২৯) এবং মৌলভীবাজারের রিজিয়া বেগম (৪৬)। তাদের জীবনগাথা বিদেশে কর্মরত বহু নারী শ্রমিকের অদেখা বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হোসনে আরা উন্নত জীবনের আশায় একমাত্র কন্যাকে দেশে রেখে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে যান। বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও কিছুদিন পর থেকেই তার জীবন নেমে আসে ভয় ও নির্যাতনের অন্ধকারে।
প্রায় নয় মাস পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা তাকে অচেতন ও বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখতে পান। তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারছিলেন না, কথা ছিল অস্পষ্ট। এমনকি নিজের নাম বা ঠিকানাও বলতে পারছিলেন না।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ব্র্যাকের মাইগ্রেশন টিমকে অবহিত করে। পরে ব্র্যাকের কর্মকর্তারা তাকে উত্তরার মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলররা পর্যবেক্ষণ করে জানতে পারেন, গভীর ট্রমার কারণে তিনি কথা বলার সক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন।
প্রথম দিকে তিনি শুধু হাত ও মাথার ইশারায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বোঝাতেন। মাঝে মাঝে ভয়ে পালানোর চেষ্টাও করতেন। পরে ধীরে ধীরে তিনি ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানান, সৌদি আরবে পুলিশ তাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেছিল। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাকে আতঙ্কিত করে তোলে।
পরে তার পাসপোর্টের তথ্যের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। ব্র্যাকের সুনামগঞ্জ মাইগ্রেশন অফিসের মাধ্যমে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মামা সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়। পরদিন তিনি ঢাকায় এসে হোসনে আরাকে নিজ দায়িত্বে বাড়িতে নিয়ে যান।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামের বাসিন্দা রিজিয়া বেগমের জীবনও ছিল সংগ্রামে ভরা। জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন তিনি। নানির কাছে বড় হওয়া রিজিয়া পরে বিয়ে করলেও সংসারে স্বচ্ছলতা আসেনি। তিন সন্তান—দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন চলছিল।
একসময় স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেলে সন্তানদের নিয়ে তিনি পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়। জীবিকার তাগিদে চা-বাগানে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। কিন্তু তাতে সংসারের অভাব দূর হয়নি। অবশেষে ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে ২০০৮ সালে দুবাই যান তিনি। পরে দেশে ফিরে ২০১৯ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে আবার সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি জমান। তাকে দুই বছরের চুক্তিতে মাসে এক হাজার রিয়াল বেতন দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেখানে গিয়ে দেখেন ভিন্ন চিত্র।
প্রতিদিন প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করানো হতো তাকে। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। প্রতিশ্রুত এক হাজার রিয়ালের বদলে দেওয়া হতো মাত্র ৭০০ রিয়াল। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নীরবে সব নির্যাতন সহ্য করতেন। পরে শারীরিক নির্যাতনও শুরু হয়।
২০২১ সালে করোনাকালে অতিরিক্ত কাজ ও অপুষ্টিতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন মেয়েকে ফোন করে দালালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে বলেন। পরিবার বড়লেখা থানায় মামলা করতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। পরে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতেও অভিযোগ করা হয়, কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি।
২০২১ সালের শেষ দিকে এক রাতে মেয়েকে ফোন করে রিজিয়া জানান, তাকে ভ্যাকসিনের নামে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং তিনি আশঙ্কা করছেন, তাকে রাতে কোথাও ফেলে দেওয়া হতে পারে। সেই ফোনকলের পর প্রায় পাঁচ বছর তার সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সন্তানরা ধরে নিয়েছিল, হয়তো তাদের মা আর বেঁচে নেই।
ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। জেদ্দা থেকে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে তাকে লক্ষ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা উদ্ধার করেন।
তখন তিনি মানসিকভাবে অসংলগ্ন ছিলেন এবং নিজের পরিচয় বা পরিবারের কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না। তার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্রও ছিল না।
পরে তাকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে ১৩ দিন নিরাপদে থাকলেও তিনি নিজের পরিচয় জানাতে পারেননি; শুধু বারবার বলতেন, “আমি মুসলিম।” পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয় এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
এরপর ব্র্যাকের টিম মৌলভীবাজারে গিয়ে তার পরিবারকে খুঁজে বের করে। ১৩ দিন পর উত্তরার ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আবেগঘন এক মুহূর্তে রিজিয়াকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে দীর্ঘ নির্যাতন ও মানসিক আঘাতের কারণে তিনি তখনও পরিবারের কাউকে চিনতে পারছিলেন না। বহুদিন পর মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে তাই মিশে ছিল গভীর বেদনা।
বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন। তার পরিবার ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন টিম তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য কাজ করছে।
সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শরীফা আশ্রাফী শম্পা বলেন, হোসনে আরা ও রিজিয়া বেগমের গল্প শুধু দুই নারীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কাহিনি নয় এটি বিদেশে কাজ করতে যাওয়া বহু নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। প্রবাসে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
সিলেট, বিশ্ব নারী দিবস, মধ্যপ্রাচ্য, নির্যাতন, ব্রাক