২৭ মে ২০২৬

অভিবাসন

বিশ্ব নারী দিবস

সৌদি–মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতন: প্রতি বছরই দেশে ফিরছেন সিলেটের শত শত নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৮ মার্চ, ২০২৬ ৪:৪৬ অপরাহ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

ভাগ্য বদলের স্বপ্নে প্রতি বছর সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার নারী পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে। সংসারের অভাব দূর করা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কিংবা পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার তাগিদে তারা মূলত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে অনেকের স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু নারী শূন্য হাতে দেশে ফিরছেন।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার রিজিয়া বেগমের ঘটনাও কম হৃদয়বিদারক নয়। ভাগ্য বদলের আশায় ছয় বছর আগে তিনি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। সেখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করানো, কম খাবার দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিল তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। অবশেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তা এবং পিবিআইয়ের সহযোগিতায় তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং ১৩ দিন পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন। বর্তমানে তার মানসিক চিকিৎসা চলছে।

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের হোসনে আরার ঘটনাও একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। উন্নত জীবনের আশায় সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। দেশে ফেরার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বিভ্রান্ত ও অসংলগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। নিজের নাম বা পরিবারের পরিচয় পর্যন্ত বলতে পারছিলেন না। পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন টিম তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে চিকিৎসা ও সহায়তা দেয় এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাড়িতে ফেরার ব্যবস্থা করে।

রিজিয়া কিংবা হোসনে আরার মতো নারীর সংখ্যা এখন অনেক। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। তবে তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের বেশিরভাগই নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। একই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ বিদেশ থেকে দেশে এসেছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি নারী মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সূচনা হয় ১৯৯১ সালে। তবে শুরুর দিকে প্রতি বছর মাত্র কয়েক হাজার নারী বিদেশে যেতেন। ২০০৪ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে নারী শ্রমিক বিদেশে যেতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে যান। আর ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে বিদেশে যান ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮ জন নারী, ২০১৬ সালে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন, ২০১৭ সালে ১ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন, ২০১৮ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৬৯৫ জন এবং ২০১৯ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৮৬ জন। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৯৩৪ জনে এবং ২০২১ সালে ৮০ হাজার ১৪৩ জন নারী বিদেশে যান। পরে ২০২২ সালে আবার ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী বিদেশে পাড়ি জমান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা কমেছে। ২০২৩ সালে ৭৬ হাজার ১০৮ জন, ২০২৪ সালে ৬১ হাজার ১৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী বিদেশে গেছেন।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া নারীদের অধিকাংশই সৌদি আরবে যান। গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সেখানে গিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই প্রবাস থেকে অর্থ পাঠিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদল করেছেন, তবে অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।

বিদেশ থেকে ফিরে আসা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, সেখানে তাদের দিয়ে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানো হয়, ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ব্র্যাক জানিয়েছে, বিদেশ থেকে ফিরে আসা নারীদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং তাদের বিশেষ সহায়তা দিতে হয়েছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে গিয়ে নারীরা সাধারণত তিন ধরনের নিপীড়নের শিকার হন। প্রথমত, কাজ ও বেতন সংক্রান্ত সমস্যা—অনেক ক্ষেত্রে তারা ঠিকমতো বেতন পান না বা একাধিক বাসায় কাজ করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয়ত, কাজের চাপ বা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে অনেক নিয়োগকর্তা তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।

তিনি বলেন, অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে বিষয়টি প্রকাশ করেন না। ফলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না। তাঁর মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া, নিরাপদ যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা এবং বিপদে পড়লে দূতাবাসের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনারও প্রয়োজন রয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

অভিবাসন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, বিশ্ব নারী দিবস, মধ্যপ্রাচ্য, নির্যাতন, ব্রাক

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ