ধান পচে গন্ধ, হাওরে ডুবছে স্বপ্ন: চরম দুশ্চিন্তায় জগন্নাথপুরের কৃষক
কৃষি
প্রকাশঃ ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১০:০৩ অপরাহ্ন
অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো বৃষ্টিতে এ বছর সিলেটে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সারি কৃষকের মুখে কিছুটা স্বস্তির হাসি ফোটালেও সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টিকছে না। কারণ ভালো ফলনের বিপরীতে ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে খরচ ওঠাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
জেলার বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে মণপ্রতি ধান বিক্রি হচ্ছে ৯২০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। কৃষকদের ভাষ্যমতে, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। তাছাড়া মৌসুমে সময়মতো শ্রমিকও পাওয়া যায় না। ফলে ফলন ভালো হলেও বাজারদর তাদের কষ্টের ন্যায্য মূল্য দিচ্ছে না। মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবেই দাম কমে গেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গোয়াইনঘাট উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, প্রতি কাঠায় গড়ে চার থেকে সাড়ে চার মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় লাভের অঙ্ক ‘নগণ্য’। সদর উপজেলার ধূপাগোল ইউনিয়নের কৃষক মুহিবুর রহমান সোয়াইব বলেন, প্রতি বিঘা জমি চাষে খরচ হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। নিজস্ব যন্ত্র থাকায় তার খরচ কিছুটা কম হলেও যাদের ভাড়া করতে হয় তাদের ব্যয় আরও বেশি। আরেক কৃষক মুক্তার হোসেন মান্না জানান, প্রতি বিঘায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে মাত্র। চালের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে ধানের দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করে কিছুটা লাভের আশা করছেন। তবে উৎপাদনের তুলনায় সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ কম হওয়ায় সবাই সেই সুযোগ পাবেন কি না এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সিলেট আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চার জেলায় ৩ হাজার ৫৮ মেট্রিক টন ধান, ১৩ হাজার ৫১৮ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ২২ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৭৮ মেট্রিক টন ধান, ৩ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ২ হাজার ৬৬৩ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে। জেলা ভিত্তিকভাবে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মুস্তফা জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ১৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। ধান কেনা হবে কেজিপ্রতি ৩৪ টাকা দরে। পাশাপাশি সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা ও আতপ চাল ৪৯ টাকা দরে সংগ্রহ করা হবে। তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে সরাসরি তাদের কাছ থেকেই ধান কেনা হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ নিতে না পারে।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম সাইফুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান ও চাল সংগ্রহ সম্পন্ন করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জেলায় রোপা আমন আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩১০ হেক্টর, আর আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯২০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল চাল হিসেবে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৮ মেট্রিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুন ফলন। শেষ মূহুর্তে যে দুইদিন তিন বৃষ্টি হয়েছে সেটার ধানের ফলনে টনিক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলাদা করে সেচের প্রয়োজন হয়নি, এতে উৎপাদন খরচও কিছুটা কমেছে। সরকার কেজি প্রতি ২৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে যা খাদ্যগুদাম সংগ্রহ করছে তবে এবার সরকার নির্ধারিত ধান চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা কিছু কম যার জন্য কৃষকদের একটু ঘাটতি হবে।
সিলেট আমন ধান, ধানের ন্যায্য দাম, বাম্পার ফলন ধান, কৃষক সংকট সিলেট, সরকারি ধান সংগ্রহ, ধান বাজারদর