সিলেটের সড়ক এখন যেন জীবন নিয়ে খেলা করার জায়গা। প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা চলাচল করছেন মানুষ, ঘটছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। 

গত তিন বছরে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে এক হাজার পনেরো জনের। আহত হয়েছেন ১,৮০৭ জন। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৭৪ জন, আহত হয়েছেন ৬৩৪ জন।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট বিভাগে ৩২টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২ জন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট ও হবিগঞ্জে, কম দুর্ঘটনা ঘটেছে মৌলভীবাজারে।

তিন বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে ৩৬৬ জন, ২০২৪ সালে ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। 

জেলার দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সিলেট জেলায় ১১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত ও ১৪৪ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলায় ৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮ জন নিহত ও ৪৯ জন আহত। 

একই সময়ে মৌলভীবাজার জেলায় ৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত ও ৬৮ জন আহত এবং হবিগঞ্জ জেলায় ১০৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত ও ২০৩ জন আহত হয়েছেন। 

এছাড়া ২০২৪ সালে সিলেট জেলায় ১৫৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৭ জন নিহত ও ৩১৪ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলায় ৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। 

মৌলভীবাজার জেলায় ৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ৭২ জন আহত হয়েছেন ও হবিগঞ্জ জেলায় ৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৫ জন নিহত ও ২১৫ জন আহত হয়েছেন।

চলতি বছরে জানুয়ারি মাসে সিলেট বিভাগে ৩৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৮ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে বিভাগে ৩২ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও ১৪৪ জন আহত হয়েছেন। 

মার্চ মাসে ২৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে ২৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছেন। মে মাসে ৩৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হয়েছেন। 

জুন মাসে ২৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন।  জুলাই মাসে বিভাগে ২৬ সড়ক দূর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৬১ জন আহত হয়েছেন এবং আগস্ট মাসে সিলেট বিভাগজুড়ে ২৬ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হয়েছেন।

সিলেট এয়ারপোর্ট  রোডে নিয়মিত বাইক চালান করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী দিদারুল  ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই এয়ারপোর্ট রোড সিলেটের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই সড়কটা অনেকটা আঁকাবাকা হওয়ায় অনেক উঠতি বয়সি তরুণরা এই সড়কে বাইক রেইস করার সময় বাঁকা রাস্তায় লিন (বাঁকা রাস্তা গতি না কমিয়ে দ্রুত পাড় হওয়া ) করে বসেন। যারা অধিকাংশই অদক্ষ।’

তিনি বলেন, ‘এই বেপরোয়া অবস্থার ফলে এই রোডেই প্রতিনিয়ত অনেকে মারা যায়, যার বেশিরভাগই তরুণ। আমরা চাই প্রশাসন এগুলোর দিকে নজরদারি বাড়াক। অনেক ছেলের লাইসেন্স থাকে না সে কিভাবে মোটরবাইক চালায় এবং পুলিশও কিভাবে তাকে ছাড় দেয় সেটাও অনেক সময় আমরা বুঝি না। তাই প্রশাসনকে  সড়কের দুঘর্টনা কমাতে হলে সড়কে কঠোর হতে হবে।’ 

নিসচার সিলেট বিভাগীয় সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, ‘সিলেটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তরুণরা গতির নেশায় আইন ভাঙছে, আর প্রশাসন কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ। এ পরিস্থিতি প্রতিদিন মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। প্রশাসনের উচিত এগুলোর ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া যাতে করে সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দেশে সড়ক পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে নীতি ও কৌশলগত ঘাটতির কারণে দুর্ঘটনা ও যানজট বেড়েছে। সড়ক মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রমে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চালু করার উদ্যোগ ঢাকা-চট্টগ্রামের যানজট আরও বৃদ্ধি করবে। তাই সরকারি উদ্যোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ম্যাস ট্রানজিট ও ডিজিটাল লেনদেনভিত্তিক বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট চালু করা প্রয়োজন। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, দুর্ঘটনা কমবে, যাতায়াতের গতি বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সুবিধা মিলবে।’

সিলেট রেঞ্জ পুলিশের (ডিআইজির দপ্তর) পুলিশ সুপার (অপারেশন ও ট্রাফিক) আমিনুল ইলাম বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত সড়ক দুঘর্টনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছি, যার মধ্যে লিফলেট বিতরণ, পথসভা রয়েছে। এছাড়া সড়কে উঠতি তরুণদের  মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত গতি নিয়েও আমরা খুব সতর্ক অবস্থানে আছি এবং এরকম কাউকে দেখামাত্র আমরা তাদের আটক করছি এবং তার কাগজপত্র চেক করছি, তার অভিভাবককে বিষয়টা জানাচ্ছি। এসবের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান খুব কঠোর এবং এটি কঠোরতার সাথেই দেখা হয়।’


শেয়ার করুনঃ

অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনা, নিরাপদ সড়ক দিবস, নিসচা, সিলেট বিভাগ, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি