ড. ইফতেখার আহমদ
আন্তর্জাতিক চা দিবস: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও চা শিল্পে AI প্রযুক্তির ব্যবহার
রাসেল আহমদ
প্রকাশঃ ৫ জুন, ২০২৬ ২:১১ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জলাভূমি। নদ-নদী, হাওর, বিল ও খালবেষ্টিত এই দেশের প্রাণপ্রবাহ নির্ভর করে মিঠাপানির সুস্থ বাস্তুতন্ত্রের ওপর। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হলে আমরা স্থলভাগের বন ও বৃক্ষ নিয়ে যতটা সচেতন, জলাভূমি ও জলজ পরিবেশ নিয়ে ততটা নই। তাই হাওরের জলজ পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জলজ উদ্ভিদ জলাশয়ের প্রহরী। জলাভূমি ভূ-পৃষ্ঠের কিডনি। তাই জলাভূমি রক্ষায় জলজ উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখা জরুরি। আমরা বায়ুমণ্ডলের পরিবেশ রক্ষায় স্থলভাগে ‘বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’ বেশ গুরুত্বের সাথেই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পন্ন করে থাকি। বৃক্ষ রক্ষায় আন্দোলন হয়, বৃক্ষ নিধন নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়। কেননা বৃক্ষ বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং অক্সিজেন দেয়। কিন্তু পানি ও জলজ পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে আমাদের সেই মাত্রার সচেতনতা এখনো গড়ে ওঠেনি।
আমরা জানি, পানির অপর নাম জীবন। বাংলাদেশ নদ-নদী আর হাওর-বিল-খালে ঘেরা সহজলভ্য মিঠাপানির দেশ। মিঠাপানির রসে ভিজে উর্বর হয় আমাদের মাটি। তাই সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা এই বাংলা। মিঠাপানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণ বা পানীয় পণ্য নয়; এই মিঠাপানিকে কেন্দ্র করেই প্রাণবৈচিত্র্য টিকে থাকে। আর এই মিঠাপানির ভারসাম্য রক্ষায় জলজ উদ্ভিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলজ উদ্ভিদ জল পরিশোধন করে। বৃক্ষের ন্যায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন সরবরাহ করে পানির গ্যাসীয় ভারসাম্য রক্ষা করে। পানিতে থাকা নাইট্রেট, ফসফেট এবং ভারী ধাতুর মতো দূষক পদার্থ শোষণ করে পানির গুণগত মান উন্নত করে। পানির উপরিভাগে আবরণ তৈরি করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং জলজ প্রাণীর খাদ্যচক্র ও আবাসস্থল সংরক্ষণ করে।
হাওরের জলাভূমিতে জলজ উদ্ভিদ ধ্বংসের ফলে শুধু মিঠাপানির গুণাগুণই নষ্ট হচ্ছে না, কৃষিজমির উর্বরতাও কমছে। জলজ উদ্ভিদ কার্বন স্টকের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ফলে এসব উদ্ভিদ বিলুপ্ত হলে উর্বর পলিমাটির গুণাগুণও হ্রাস পায়। কৃষি, মৎস্য এবং জীববৈচিত্র্য- সবকিছুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল ছিল কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্যপূর্ণ মিঠাপানির সহজলভ্য আধার। বাংলাদেশ পানিউন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ৪২৩ টি হাওর থাকার কথা, কিন্তু বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৪১৪টি হাওর রয়েছে। বর্তমানে এসব হাওরে প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬০ হেক্টর জলাভূমি জুড়ে জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। স্থায়ী ও অস্থায়ী জলাশয় বা বিল প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি।
কৃষি গবেষণা বলছে,১৯৪৭ এর দেশভাগের পরও হাওর অঞ্চলে বিলসহ জলাভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুই শিক্ষার্থী ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে হাওরের মোট আয়তন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩৪ বর্গকিলোমিটার। ২০২০ সালে তা কমে হয়েছে প্রায় ৪০৬ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ তিন দশকে হাওর কমেছে প্রায় ৮৬ শতাংশ। এতে করে বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আইইউসিএন-এর তথ্যমতে, হাওর জলাশয়ে একসময় জলজ উদ্ভিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০-এরও অধিক প্রজাতি। বর্তমানে তা ১০০ প্রজাতিরও নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি জলজ উদ্ভিদ ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে হাওরের মিঠাপানির স্বাভাবিক ভারসাম্যও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
গত কয়েক দশকে হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের কয়লা ও পাথরখনির দূষিত রাসায়নিক বর্জ্য, অতিরিক্ত পলি, পানি প্রবাহের পরিবর্তন, জলাশয় খননের কারণে গভীরতার পরিবর্তন, নগরায়ণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, শিল্পবর্জ্য এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জলজ উদ্ভিদ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত মৌসুমী বৃষ্টিপাত ও খরাও জলজ উদ্ভিদের জীবনচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
হাওরের পরিবেশগত অবক্ষয়ের আরেকটি কারণ অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। বর্ষা মৌসুমে পর্যটনবাহী যান্ত্রিক নৌযানের অতিরিক্ত চলাচল, শব্দদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু উদ্ভিদজগতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। গবেষকগণের মতে, একসময় হাওরে আহরিত মাছের প্রায় ২৬০ প্রজাতি ছিল। দেশের মিঠাপানির মাছের বৃহৎ প্রজননকেন্দ্র ও ‘মাদারফিশারী’ খ্যাত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ৮-১০ বছর আগে ১৪১ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৮৩ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম ইউনিভার্সিটির গবেষণায়ও দেশি মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
শুধু মাছ নয়, ব্যাঙ, সাপ, সরীসৃপ, কচ্ছপ, শামুক-ঝিনুক ও পোকামাকড়সহ অসংখ্য জলজপ্রাণের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় ও অতিথি পাখিদের খাদ্যসংস্থান কমে যাচ্ছে। বার্ডস ক্লাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে হাওরে অতিথি পাখির সংখ্যা প্রায় ৮৫ শতাংশ কমেছে। ফলে হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
তাই হাওর রক্ষায় বিলুপ্তপ্রায় জলজ উদ্ভিদ চিহ্নিতকরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। পাশাপাশি জলাভূমির ধরণ বিবেচনায় সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আমাদের হাওরের জলাভূমিগুলি মূলত অন্তর্দেশীয় এবং আংশিক মানবসৃষ্ট। গ্রীষ্মকালীন, বর্ষাকালীন ও জলপ্লাবন জলাভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জলজ উদ্ভিদের আধিপত্য রক্ষা করা প্রয়োজন।
পানির বিশুদ্ধতা ও জলজ পরিবেশ রক্ষার জন্য হাওরাঞ্চলে 'জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ অঞ্চল' ঘোষণা করা যেতে পারে। স্থানীয় জাতের জলজ উদ্ভিদের বীজ ও মূল সংগ্রহ করে ‘জলজ উদ্ভিদ নার্সারি’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। 'বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'র ন্যায় 'জলজ উদ্ভিদ রোপণ ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি' গ্রহণ করা জরুরি।
স্থানীয় জাতের নল-খাগড়া, ইকড়, কাটনল, জালিবেত, শাপলা-শালুক, পদ্ম, কেওড়ালী, পানিফল, হুগল, হেলেঞ্চা, ধৈঞ্চা, কলমি, কচুরিপানা, বিভিন্ন ভেষজ, গুল্ম ও শৈবালসহ হিজল, করচ, বরুণ, বিয়াশ, তমাল, বাঁশ, মুর্তা ও অন্যান্য দেশীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ, রোপণ ও চাষে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
জলাশয়ে জলজ উদ্ভিদ টিকে থাকলে বাংলাদেশের হাওরের মিঠাপানির অমূল্য সম্পদ স্বাদুমাছ টিকে থাকবে। টিকে থাকবে শামুক-ঝিনুকসহ জলজ কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য। স্থানীয় ও অতিথি পাখিদের খাদ্যসংস্থান বাড়বে। জলজ পাখির আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, মাটির উর্বরতা বজায় থাকবে এবং পানির গুণগত মানও উন্নত হবে।
সর্বোপরি বলা যায়, হাওরের জলজ পরিবেশ টিকে থাকলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে। শুধু তাই নয়, জলজ পরিবেশের সাংস্কৃতিক মূল্যও অনেক। জলজ উদ্ভিদ খাদ্য, ঔষধ, জ্বালানি, পশুখাদ্য ও নানা হস্তশিল্পে ব্যবহৃত হয়ে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো জলাভূমিকে সম্পদ হিসেবে যতটা দেখি, তার প্রাণভিত্তি জলজ উদ্ভিদকে ততটা গুরুত্ব দিই না। বন উজাড় হলে যেমন আমরা উদ্বিগ্ন হই, তেমনি জলজ উদ্ভিদ বিলুপ্ত হলেও সমানভাবে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। কারণ বৃক্ষ যেমন স্থলভাগের পরিবেশ রক্ষা করে, তেমনি জলজ উদ্ভিদ রক্ষা করে মিঠাপানির পরিবেশ।
হাওর রক্ষার অর্থ শুধু মাছ, পাখি বা কৃষি রক্ষা নয়; হাওর রক্ষার অর্থ মিঠাপানির জীবনচক্র রক্ষা করা। আর সেই জীবনচক্রের অন্যতম ভিত্তি হলো জলজ উদ্ভিদ। তাই এখনই হাওরাঞ্চলে 'জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ অঞ্চল' ঘোষণা, দেশীয় জলজ উদ্ভিদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরিকল্পিত জলজ উদ্ভিদ সম্প্রসারণ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় আমরা শুধু কিছু উদ্ভিদ হারাব না, হারাব বাংলাদেশের মিঠাপানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি। টিকে থাকুক বাংলাদেশের ‘কিডনি’ খ্যাত হাওরাঞ্চল, টিকে থাকুক তার প্রাণবৈচিত্র্য, ভালো থাকুক বাংলাদেশ, টিকে থাকুক প্রাকৃতিক পরিবেশ।
[সিলেট ভয়েস-এ প্রকাশিত অভিমত, মতামত, কলাম ও চিঠিপত্র একান্তই লেখকের নিজস্ব।]