২৬ জুন ২০২৬

রাজনীতি

শাহজালাল মাজার কমিটিকে ঘিরে আলোচনায় মুক্তাদির-আরিফ দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৬ জুন, ২০২৬ ৮:১৩ অপরাহ্ন


সিলেট বিএনপিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরীর শক্ত বলয় রয়েছে। দুজনেই বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। গত সংসদ নির্বাচনে দুজনেই চেয়েছিলেন সিলেট-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। সবশেষ দলের সিদ্ধান্তে সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আর সিলেট-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আরিফুল হক চৌধুরী। 

 

রাজনীতিতে আধিপত্যের পাল্লা দুজনেরই সমানে-সমান। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দুজনেই মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মুক্তাদির। অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন আরিফ।

 

মন্ত্রীত্বের দায়িত্বে আসার পর দুজনের মধ্যে কোনো বিভেদ বা বলয় প্রকাশ্যে না আসলেও শুক্রবার (২৬ জুন) নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই দুই মন্ত্রী। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গঠিত ১২ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে কেন্দ্র করে এবার নতুন রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে সিলেটে। 

 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ১২ সদস্য। সেখানে জায়গা হয়নি প্রবাসীকল্যান মন্ত্রী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের টানা দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। 

 

কমিটিতে যারা জায়গা পেয়েছেন তাদের বেশিরভাগই স্থানীয় রাজনীতিতে মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে জনশ্রুতি রয়েছে। অবশ্য বিএনপির রাজনীতির বাহিরে তাদের পরিচয় রয়েছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে।  

 

বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা পরিষদের প্রশাসক, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন সদস্য, মাজার মাদরাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধি। কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।

 

১২ সদস্যের কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও রেজাউল হাসান কয়েস লোদী সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুজনেই খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্টজন হিসেবে সিলেটে জনশ্রুতি রয়েছে। 

 

এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম কমিটিতে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কমিটি ঘোষণার দিন আরিফুল হক চৌধুরী নিজেও এলাকায় ছিলেন।

 

তাছাড়াও মাত্র দুই দিন আগে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মাজারের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে এবং সিলেটের সব সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজকে নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে গঠিত কমিটিতে তাঁর নাম না থাকায় আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

 

কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখার কারণ জানতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি সাঁড়া দেননি। একইভাবে কমিটিতে না থাকার প্রতিক্রিয়া জানতে আরিফুল হক চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনিও সাঁড়া দেননি। 

 

এদিকে কমিটি ঘোষণার বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির কেউ মুখ খুলছেন না। এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক মিফতা সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

 

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ নিয়ে লেখালেখি করছেন। আরিফুল হক চৌধুরীকে কমিটিতে না রাখার সমালোচনা করে সাংবাদিক মাসুদ আহমদ রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয় নয়; এটি পুরো সিলেটের ঐতিহ্য। তাই সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিকে বাইরে রাখায় প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

 

সিলেট মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এমন একটি কমিটিতে সিলেটের মন্ত্রী ও দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, আরিফুল হক চৌধুরীকে সদস্য না করলেও অন্তত পরামর্শক বা আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হলে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। 

 

যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কমিটি গঠনের পর বলেছেন, দরগাহর উন্নয়ন ও দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা আনতে মাজার কর্তৃপক্ষসহ সকলেই একমত হয়েছেন। 

 

পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাই প্রধান লক্ষ্য জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত বিদ্যমান কমিটি নিয়ম অনুযায়ী দানের টাকা গণনা করবে এবং তা চলমান ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে।

 

বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগ ও মাজারের দানবাক্স সিলগালা করা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পেছনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তবে কাজ করার দুটি পদ্ধতি আছে। একটি হলো-কাজ করা, আর আরেকটি হলো—সবাইকে নিয়ে কাজ করা। যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকে, কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। আমরা সেরকম উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে স্বচ্ছতাও আসবে, সবার অংশগ্রহণও থাকবে।’ 

 

উল্লেখ্য, গত ১২ জুন তৎকালীন ডিসি সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। এই ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। 

 

প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন সোমবার (২২ জুন) বেলা দুইটায় বিদায়ী ডিসির নির্দেশনায় দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেগগুলো খোলা হয়। পরে ৭০০ বছরের প্রথা ভেঙে দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। গণনা শেষে জেলা প্রশাসন জানায়-চারদিনে আটটি ডেগ ও দানবাক্সে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া গেছে।


শেয়ার করুনঃ

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন

শাহজালাল মাজার, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট বিএনপি, মাজার কমিটি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ