চীনা ঋণে ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের উদ্যোগ, ডাবল লাইনের দাবিও জোরালো
দশ বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে এগোচ্ছে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ প্রকল্প
সিলেটজুড়ে
প্রকাশঃ ৩ আগস্ট, ২০২৬ ২:৪৬ অপরাহ্ন
প্রায় এক দশক ধরে অর্থায়ন সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকা আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প আবারও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। প্রায় ১৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পে চীনের সরকারি ঋণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রেল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আশা আরও জোরালো হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে উন্নীত হবে। নতুন অবকাঠামোতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে প্রকল্পটির পরিকল্পনা নেওয়া হলেও অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, চীন ও ভারতের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়নের বাইরে ছিল। পরে অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি থেকেও প্রকল্পটি বাদ পড়ে। তবে সম্প্রতি চীন পুনরায় সরকারি ঋণ দিতে সম্মত হওয়ায় প্রকল্পটি নতুন করে গতি পেয়েছে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের সরকারি ঋণ হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেতে পারে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিআরসিসি)।
প্রকল্পের আওতায় ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল রেললাইন এবং ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে। সব মিলিয়ে ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত হবে। এর মাধ্যমে ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে এবং আন্তঃঅঞ্চল রেল যোগাযোগের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তবে শুধু ডুয়েলগেজ নির্মাণেই সীমাবদ্ধ না থেকে একই সঙ্গে ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিও জোরালো হচ্ছে। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, ডাবল লাইন হলে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলাচল, ক্রসিংজনিত বিলম্ব কমানো এবং ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
এ ব্যাপারে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, 'ডুয়েলগেজ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে ডাবল লাইন করা গেলে এই রুটের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে এক লাইনের কারণে ট্রেন ক্রসিংয়ে সময় নষ্ট হয়। ডাবল লাইন হলে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন উভয়ের চলাচল আরও সহজ হবে।'
বর্তমানে আখাউড়া-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয় জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেসে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কিন্তু পুরোনো রেললাইন, মেয়াদোত্তীর্ণ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে এই রুটে অনেক স্থানে ট্রেনকে ধীরগতিতে চলতে হয়।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে অন্তত ১৩টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একসময় যেখানে ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করত, বর্তমানে অনেক অংশে সেই গতি কমে প্রায় ৪০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এতে যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।
এই রুটে নিয়মিত যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, 'বর্তমানে ঢাকা-সিলেট যেতে অনেক সময় লাগে। মাঝেমধ্যে ট্রেন দীর্ঘক্ষণ বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষা করে। ডাবল লাইন হলে যদি যাত্রার সময় কমে, তাহলে সাধারণ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।'
অন্যদিকে, প্রকল্পটির ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একই ধরনের অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় এখানে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া ঠিকাদার নির্বাচন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে সরকারের অবস্থান হলো, দেশের রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সিলেট সফরে এসেছিলেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তখন তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, 'অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ সেবাটুকু নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।'
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু রেল যোগাযোগের গতি বাড়বে না, সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, পর্যটন এবং পণ্য পরিবহনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা। একই সঙ্গে ডুয়েলগেজের পাশাপাশি ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিও বাস্তবায়িত হলে এই রেলপথের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ প্রকল্প, আখাউড়া সিলেট রেললাইন, ডুয়েলগেজ রেল, ডাবল লাইন দাবি, সিলেট রেল যোগাযোগ, চীনা ঋণ, ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প